কুমিল্লা জিলা স্কুল বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৮৭ বছরের সুদীর্ঘ যাত্রায় এটি শুধু জ্ঞান বিতরণই করেনি, জন্ম দিয়েছে এমন সব ব্যক্তিত্বের যারা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব দরবারে রেখেছেন অবদান।
১. প্রতিষ্ঠার সূচনা ও ঐতিহাসিক পটভূমি:
প্রতিষ্ঠা: ২০ জুলাই, ১৮৩৭
প্রতিষ্ঠাতা: হেনরি জর্জ লেসিস্টার
প্রথম নাম: Comilla Government School (মাত্র ৪০ জন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু হয়)
স্বীকৃতি: ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য: ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটানো।
২. অবস্থান ও অবকাঠামো:
কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ে ৫.৬৯ একর সুবিশাল ক্যাম্পাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়। এর সমৃদ্ধ অবকাঠামো শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করে:
একাডেমিক ভবন: ৩টি, হোস্টেল: ২টি
অন্যান্য সুবিধা: প্রশাসনিক ভবন, ৫টি সুসজ্জিত বিজ্ঞানাগার, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, সুপরিসর অডিটোরিয়াম, মসজিদ, শহীদ মিনার, আবু জাহিদ মিলনায়তন, একটি বড় খেলার মাঠ এবং বাস্কেটবল কোর্ট।
৩. একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব ও সহশিক্ষা কার্যক্রম:
কুমিল্লা জিলা স্কুল শিক্ষাক্ষেত্রে বরাবরই শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রেখেছে।
পরীক্ষার ফলাফল: কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত SSC ও JSC পরীক্ষায় একাধিকবার শীর্ষস্থান অধিকার করেছে।
সাম্প্রতিক সাফল্য: ২০১৯ সালে ৩৩৯ জন শিক্ষার্থী GPA 5 পেয়ে প্রায় ৯০% সাফল্যের হার অর্জন করে।
৪. শিক্ষা কাঠামো ও হাউজ সিস্টেম:
বিদ্যালয়ে প্রভাতি ও দিবা — দুটি শিফটে প্রায় ২,০০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করে। ৫৩ জন অভিজ্ঞ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাঠদানে নিযুক্ত আছেন। প্রতিটি শ্রেণিতে ৪ থেকে ৬টি সেকশন রয়েছে।
৫. মুক্তিযুদ্ধে গৌরবজনক ভূমিকা:
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লা জিলা স্কুলের রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।
অংশগ্রহণ: মোট ১৩৯ জন শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
শাহাদাতবরণ: ১০ জন Zillian দেশের জন্য শহীদ হন। তাঁদের আত্মত্যাগের স্মরণে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার ও আবু জাহিদ মিলনায়তন নির্মাণ করা হয়েছে। শহীদ আবু জাহিদ ছিলেন এই বিদ্যালয়েরই গর্বিত ছাত্র, যাঁর নামে মিলনায়তনটি উৎসর্গ করা হয়েছে।
৬. ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলন – ১৯৮৯
১৯৮৯ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে Zillians-রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৎকালীন স্বৈরশাসক এইচ. এম. এরশাদ-এর বিমান কুমিল্লা বিমানবন্দরে অবতরণ করতে না দিয়ে ছাত্ররা প্রতিবাদ জানায় ও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই ঘটনা গণতান্ত্রিক চেতনার ছাত্র নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
৭. বিশিষ্ট প্রাক্তন ছাত্রবৃন্দ:
কুমিল্লা জিলা স্কুল অসংখ্য কৃতী সন্তানের জন্ম দিয়েছে, যাঁরা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন:
চিফ জাস্টিস এবিএম খায়রুল হক
চিফ জাস্টিস সৈয়দ মাহমুদ হোসেন
বিচারপতি মামনুন রহমান
বিচারপতি এ কে এম রবিউল হাসান সুমন
ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ – বাংলাদেশের সাবেক আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী।
গোলাম রহমান – বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান।
কামরুল আহসান –বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র সচিব এবং বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া (সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান)
ড. কনক কান্তি বড়ুয়া (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য)
শচীন দেববর্মণ (কিংবদন্তী সংগীতশিল্পী)
হিমাংশু দত্ত (খ্যাতনামা সংগীতশিল্পী)
শিব নারায়ণ দাশ (বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার প্রথম ডিজাইনার)
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (সংবিধান প্রণেতা ও ভাষা আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব)
(শীঘ্রই কুমিল্লা জিলা স্কুলের ৫০ জন খ্যাতনামা ও কৃতী প্রাক্তন ছাত্রকে নিয়ে একটি পৃথক লেখা প্রকাশিত হবে।)
৮. প্রশাসন, আইন, সশস্ত্র বাহিনী ও কূটনীতিতে Zillians
শুধু শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গই নন, কুমিল্লা জিলা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্ররা (Zillians) প্রশাসন, আইন, সশস্ত্র বাহিনী, কূটনীতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পেশায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন।
আইন: জেলা ও দায়রা জজ, হাইকোর্টের বিচারপতি, বহু জেলা পিপি, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।
প্রশাসন ও কূটনীতি: সচিব, অতিরিক্ত সচিব, কূটনীতিক, রাষ্ট্রদূত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী: ডিআইজি, এসপি, র্যাব, ও BGB-এর গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন।
সশস্ত্র বাহিনী: আর্মি, নেভি, এয়ার ফোর্সে কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার, মেজর জেনারেল, রিয়ার অ্যাডমিরাল, এয়ার ভাইস মার্শাল পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
শিক্ষা ও গবেষণা: দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক।
আন্তর্জাতিক সংস্থা: WHO, UNDP, World Bank, IOM-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।
✅ “Zillians are shaping the nation—in courtrooms, campuses, command centers, and cabinets.”
৯. বন্ধুদের গৌরব ও ব্যাচের কৃতিত্ব:
আমার সহপাঠীরা আজ দেশের গর্ব। তাঁদের সততা, আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও দায়িত্বশীলতা জাতির সেবায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
হাইকোর্টের বিচারপতি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্নেল ও ব্রিগেডিয়ার।
এআইজি, এডিআইজি, এসপি এবং প্রশাসনিক পুলিশ কর্মকর্তা।
অতিরিক্ত সচিব ও ক্যাডার প্রশাসক।
বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তা।
❤ ব্যক্তিগত অনুভব: আমি গর্বিত যে আমার সহপাঠীরা সততা, আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও দায়িত্ব নিয়ে জাতির সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন। তারা শুধু ক্লাসে আমার পাশে বসেছিল না, আজ তারা জাতির পাশে দাঁড়িয়েছে।
১০. আধুনিকীকরণ ও ভবিষ্যতের পথ
কুমিল্লা জিলা স্কুল আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে:
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: ব্রিটিশ কাউন্সিলের “Connecting Classrooms” প্রকল্পে সক্রিয় অংশগ্রহণ।
ডিজিটাল রূপান্তর: প্রাক্তন ছাত্রদের সহায়তায় বিদ্যালয় ডিজিটাল রূপান্তরের পথে হাঁটছে।
শিক্ষার্থী সহায়তা: বৃত্তি প্রদান, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে একটি উন্নত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক: যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বব্যাপী প্রাক্তন ছাত্রদের (Alumni) সক্রিয় অধ্যায় (Chapters) রয়েছে, যা বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে সহায়তা করছে।
উপসংহার:
কুমিল্লা জিলা স্কুল কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি ইতিহাস, আন্দোলন, প্রজন্মের স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের পথনির্দেশ। ১৮৩৭ সাল থেকে শুরু করে আজ অবধি Zillians যে গৌরবময় ধারা সৃষ্টি করেছে, তা আগামী শতাব্দীতেও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
“জ্ঞানই শক্তি”— এই মূলমন্ত্রে এগিয়ে যাক কুমিল্লা জিলা স্কুল। Once a Zillaian, always a Zillaian.
লেখক: অ্যাডভোকেট এফ. আহমদ শান্ত
(প্রাক্তন ছাত্র, কুমিল্লা জিলা স্কুল)
জজ কোর্ট, কুমিল্লা
মোবাইল : 01724813670
advocate.shanto1973@gmail.com

অ্যাডভোকেট এফ. আহমদ শান্ত :