১৯৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের রক্তঝরা প্রতিটি দিনই ত্যাগ, মানবতা ও অ-সাম্প্রদায়িক চেতনা, অধিকার প্রতিষ্ঠার সাক্ষ্য বহন করে। সেই চেতনায় আগামীর বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয় দেবীদ্বারে হানাদারমুক্ত দিবসের আলোচনা সভায়।

বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) সকালে দেবীদ্বার উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে যথাযোগ্য মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হয় দেবীদ্বার হানাদারমুক্ত দিবসের আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের অনন্য চেতনা লালন করেই আমরা সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলব।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দেওয়ার মো. জাহাঙ্গীরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত স্মৃতিচারণ সভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মূন্সী আব্দুর রৌউফ,বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সফিউল্লাহ মাস্টার,সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী আব্দুস সামাদ, সাংবাদিক সফিউল আলম রাজীব, সাংস্কৃতিক কর্মী মো. দেলোয়ার হোসেন, বৈসম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা কাজী নাছির উদ্দিন, মো. নাঈম হাসান প্রমুখ।
স্বাগতিক বক্তব্য রাখেন,দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার। এর আগে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। পরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’ ও ‘গণকবরে’ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, উপজেলা প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ। আলোচকরা জানান, ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর দেবীদ্বার পাক হানাদারদের কবল থেকে মুক্ত হয়। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চল একে একে হানাদার দখলমুক্ত হয়। ওইদিন মুক্তিবাহিনী কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের কোম্পানীগঞ্জ সেতু মাইন বিস্ফোরণে ধ্বংস করে দেয়। মিত্রবাহিনীর ২৩ মাউন্টেন ডিভিশনের জেনারেল আর. ডি. হিরার নেতৃত্বে ট্যাংক বহর দেবীদ্বারে প্রবেশ করলে পাক হানাদাররা রাতের আঁধারে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা তখন হানাদারমুক্ত এলাকায় অগ্রসর হচ্ছিলেন। তবে দেবীদ্বার-চান্দিনা সড়কের মোহনপুর এলাকায় ভুল বোঝাবুঝির কারণে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। এতে মিত্রবাহিনীর ছয় সেনা শহীদ হন। সেদিনই দেবীদ্বারের আকাশে উড়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা; বিজয়ের উচ্ছাসে প্রকম্পিত ও উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে দেবীদ্বার উপজেলা সদর।
আলোচনায় বক্তারা জানান, ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের নিকটবর্তী হওয়ায় এ অঞ্চল ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। স্বাধীনতার পাঁচ দিনের মাথায় মুক্তিযোদ্ধারা পাক-সেনার সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে লড়ে ইতিহাসের প্রথম বিজয় ছিনিয়ে আনেন। এতে ১৫ পাক-সেনা নিহত হয় এবং ৩৩ জন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ভানী, বরকামতা ও অন্যান্য এলাকায় যুদ্ধে বহু পাক-সেনা নিহত হয়। যার মাশুলও দিতে হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষকে। পাক- হানাদারদের বর্বরতার স্বাক্ষী ১৯ শহীদের গণকবর আজও অক্ষত রয়েছে, নৌ কমান্ডো শহীদ আবুবকরের কবর, ভূষনার ৬ শহীদের কবর, ভিড়াল্লার শহীদ মজিবুর রহমানের কবর, বরকামতার ২৬ শহীদ, মাওলানা আজীমুদ্দিন পীরের দুই নাতির কবর, মহেশপুরের ১৪ মুক্তিযোদ্ধার কবর,বারুর গ্রামের শহীদ যোদ্ধার কবরসহ অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন। দেবীদ্বার ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ সড়ক। ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে যোদ্ধা ও নেতাদের ভারত সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান সড়ক ছিল এটি। প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের এলাহাবাদের বাড়িতে দুটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও ছিল এবং ফতেহাবাদের ‘নলআরা’ জঙ্গল। মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যার দিক থেকে দেবীদ্বার ছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুক্তিযোদ্ধা অধ্যুষিত এলাকা।

বিশেষ প্রতিনিধি: