প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

১১ ঘণ্টা কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে বেঁচে ফিরেছিলেন বীর মোহাম্মদ আলী

লাকসাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি :

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লার লাকসাম ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অন্যতম ভয়ংকর সামরিক ঘাঁটি। রেলওয়ে জংশন, লোকোশেড, গুদাম ও সিগারেট ফ্যাক্টরির ভেতরে ছিল ব্যাংকার ও জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র। প্রতিদিনই চলত হত্যা, নির্যাতন আর ধ্বংসযজ্ঞ। এই রক্তাক্ত প্রান্তরে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছিলেন অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাদেরই একজন যুদ্ধকালীন সহকারী প্লাটুন কমান্ডার মোহাম্মদ আলী।

 

অশীতিপর এই মুক্তিযোদ্ধা আজও ভুলতে পারেন না ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবরের সেই ভয়াল দিনটি। সেদিন সকালে খবর আসে, লাকসাম রেলওয়ে জংশনের পাশের সিগারেট ফ্যাক্টরি থেকে পাক সেনারা গৈয়ার ভাঙ্গার দিকে রওনা হয়েছে। উদ্দেশ্য—গ্রামে তাণ্ডব চালানো। মোহাম্মদ আলী সঙ্গে সঙ্গে তার প্লাটুন নিয়ে পজিশনে যান। মুক্তিযোদ্ধারা হামলা চালালে হানাদার বাহিনী পালটা আক্রমণ করে।

 

চারদিক কেঁপে ওঠে গুলি ও মর্টারের শব্দে। একে একে শহীদ হন মনোরঞ্জন, দেলোয়ার হোসেন, মনি ও মুকলেছ। চোখের সামনে সঙ্গীদের প্রাণ হারাতে দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে মোহাম্মদ আলীর। তখনই তিনি ও সহযোদ্ধা শফিক একটি ডোবায় আশ্রয় নেন। মাথায় কচুরিপানা তুলে ১১ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন পানির নিচে। শ্বাস নিতে হয় হিসাব করে। পাক সেনারা এতটাই কাছে এসেছিল যে, তাদের কথা পর্যন্ত শুনতে পেয়েছিলেন। সামান্য নড়াচড়াতেই হয়তো প্রাণ হারাতে হতো।

 

ঠান্ডায় শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল। গভীর রাতে চারপাশ শান্ত হলে তারা ডোবা থেকে বেরিয়ে আসেন এবং এলাকাবাসীর সহায়তায় নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছান। মোহাম্মদ আলীর ভাষায়, “সেই ১১ ঘণ্টা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি জীবন শেষ।”

 

তিনি আরও জানান, লাকসামে প্রতিদিনই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতো। ট্রেনে করে ধরে আনা হতো অসংখ্য মানুষকে—ছাত্র, যুবক, কৃষক, গ্রামবাসী। সন্দেহ হলেই নির্যাতন চালানো হতো। সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল নারী যাত্রীদের ওপর নির্যাতন।

 

বর্তমানে মোহাম্মদ আলী লাকসাম উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার জীবনের এই অধ্যায় শুধু ইতিহাস নয়, প্রজন্মের জন্য এক অনন্য শিক্ষা।

প্রিন্ট করুন