প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

পাকিস্তান জাতীয় দল ও ঢাকা মোহামেডানের প্রবীন ফুটবলার হুমায়ুন কবীর নীরবে চলে গেলেন না ফেরার দেশে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :

জন্ম ১৯৩৪ ইং সালের ৫ নভেম্বর কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী জনপদ ময়নামতির সিন্ধুরিয়াপাড়া গ্রামে। মৃত্যু ২০১৯ ইং সালের ২৭ নভেম্বর। ১৯৪৮ সালে কৈশোরেই খেলা শুরু করে ১৯৫০ সালে নবম শ্রেনীতে পড়ার সময় প্রথম বিভাগের ফুটবল দল কুমিল্লা ইউনিয়ন ক্লাবে খেলা শুরু। এসময় তিনি কুমিল্লা জিলা স্কুল ও কুমিল্লা ইউসুফ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৫২, ৫৩ ইং সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ টিমেও অধিনায়ক হয়ে খেলেছেন কৃতিত্বের সাথে। জীবদ্দশায় স্মৃতি চারণে বলেছিলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ড. আখতার হামিদ খানের উৎসাহ, অনুপ্রেরণার।

২০১৯ সালের ৫ নভেম্বর ৮৬তম জন্মদিনে পরিবারের সদস্যদের সাথে হুমায়ুন কবীর

১৯৫১ থেকে এসময় তিনি ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও হবিগঞ্জ মোহামেডানে খেলার পাশাপাশি ১৯৫৪ সালে ঢাকা জিমখানা স্পোর্টিং ক্লাবে খেলেন। ১৯৫৬-১৯৫৯ পর্যন্ত কুমিল্লা পাক ইউনাইটেড, ১৯৫৫ সালে পাকভারতের বিখ্যাত ফুটবলার মরহুম শাহজাহানের অনুরোধে পুর্ণগঠিত ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগদান করেন। সেসময় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শেরে বাংলা একেএম ফজলুল হক মোহামেডান ক্লাব টেণ্ট উদ্বোধন করতে এসে তার সাথে করমর্দন করেন এবং ভালো খেলার অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন।

 

৫৬ সালে মোহামেডান অপরাজিত লীগ রানার্স-আপ হয়। ১৯৫৭ ইং সালে মোহামেডান ঢাকা লীগ চ্যাম্পীয়ান হয়। সেই দলের গর্বিত সদস্য ছিলেন হুমায়ুন। জীবদ্দশায় স্মৃতিচারণ করে হুমায়ুন বলেছিলেন, ১৯৫৭ সালে মোহামেডানের সেসময়ের লেফটআউট মরহুম শাহআলমের অনুপস্থিতিতে তিনি (হুমায়ুন) রাইটআউট পজিশন ছেড়ে লেফট আউট পজিশনে খেলেন। একদিন মাঠে খেলা ছিল মোহামেডানের সাথে পুলিশের। সেটা দেখছিলেন বিগত উনিশ শতকের ৩০ দশকের উপমহাদেশের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হাফিজ রশিদ।

খেলোয়াড় হিসেবে পাওয়া বিভিন্ন ট্রফি-২

তিনি বিরতি’র সময় মাঠে এসে হুমায়ুনকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, তোমার খেলা দেখে আমার মনে হয়েছে “আজ মাঠে আমি জুনিয়র নুর মোহাম্মদের খেলা দেখেছি”। জুনিয়র নুর ছিলেন উপমহাদেশের ৩০ দশকের সেরা লেফট আউট। আরেকটি স্মৃতিচারণ ছিল, ১৯৫৬ সালে ঢাকা ষ্টেডিয়াম মাঠে। খেলাটি ছিল মোহামেডানের সাথে ফায়ার সার্ভিসের। ওইদিন তিনি রাইট আউট খেলছিলেন। পুরো খেলায় মোহামেডান প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করে খেললেও গোল পাচ্ছিলনা। খেলা শেষ হওয়ার ৩ মিনিট পূর্বে মোহামেডান একটি কর্ণার পায়।

 

লেফট আউট শ্হাআলম বল বসায় কিক নিতে। শাহজাহান ভাই গ্যালারী থেকে দৌড়ে চিৎকার করতে করতে এসে বলে শালআলম তুমি না হুমায়ুন কিক নিবে। এসময় তিনি বলটি নিজ হাতে বসিয়ে হুমায়ুনকে বলেছিল রেইনবো কিক করো। এদিকে মাঠের খেলা পরিচালনায় থাকা রেফারী ঈসা খাঁন এসে শাহজাহানকে কিছুটা ধমক দিয়ে বলটি নেড়ে দিলেন। পরে হুমায়ুন আবারো বলটি নিজের মতো করে বসিয়ে রেইনবো শট করেন। ফায়ার সার্ভিসের ডিফেন্ডার চাঁদ ভাই আপ্রাণ চেষ্টা করেও মাথায় লাগাতে পারেনি বলটি। ফলে সরাসরি বল ফায়ার সার্ভিসের জালে ঢুকে যায়। মোহামেডান এক গোলে বিজয়ী হয়। তার স্মৃতি চারণে আরো ছিল ’৫৭ সালের একটি ঘটনা। মোহামেডানের সাথে খেলা ছিল তৎকালীন ইপিআর এর। মধ্যমাঠের কিছুটা কাছাকাছি ফ্রি কিক পায়। হুমায়ুন ফ্রি কিক নিতে বল বসালে দৌড়ে এসে মারি বললো সে কিক নিবে। বলটি ইপিআরের এক খেলোয়াড়ের গায়ে লেগে ফিরে আসলে সামনে থাকা হুমায়ুন চলন্ত বলে গোলবারে কিক নেন।

২০১৪ সালে প্রয়াত হুমায়ুন কবীর প্রিয় ক্লাব মোহামেডান’েএ গেলে তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু, ফুটবলার কায়কোবাদ,বাবলুসহ অন্যান্যরা

বলটি সরাসরি ইপিআরের গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে গোলবারে প্রবেশ করে। পরদিন বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার লাডু ভাই আজাদ পত্রিকায় লিখেছিলেন, “এতোদুর থেকে এরকম একটি দর্শনীয় গোল সত্যিই বিরল”। তিনি ১৯৫৬ থেকে ৬০ সাল খেলোয়াড় থাকাকালিন কুমিল্লা ৩ বার আন্তঃজেলা ফুটবলে চ্যাম্পিয়ান হয়। ১৯৫৬ সালে কুমিল্লা চ্যাম্পিয়নের পর তৎকালীন রেলওয়ে জেনারেল ম্যানেজার এস এ বারী বাংলাশে রেলওয়েতে খেলোয়াড় হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব করলে পিতা মরহুম ফরিদ উদ্দিনের অনুমতি নিয়ে সেখানে কর্মজীবন শুরু করেন। এসময় তিনি রেলওয়ে ছাড়াও জাতীয় দলের হয়ে বার্মা, ভারত, পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্নস্থানে সুনামের সাথে খেলায় অংশ নেন। পুরস্কার হিসেবে পান অনেক মেডেল, কাপ, সার্টিফিকেট।

১৯৫৬ সালে ঢাকা ষ্টেডিয়াম মাঠে পাকিস্তান অর্থমন্ত্রী আমজাদ আলী একাদশ বনাম পূর্ব পাকিস্তান চীফ মিনিষ্টার আবু হোসেন সরকার একাদশের প্রদর্শনী ফুটবল খেলোয় প্রধান অতিথি আমজাদ আলীর সাথে হাত মেলানো হুমায়ুন কবীর।

খেলোয়াড়ী জীবনে ১৯৫৫ সালে কুমিল্লা জেলা দলের হয়ে কুমিল্লা ষ্টেডিয়ামে ভারতের বিখ্যাত সেন্টার ফরোয়ার্ড মেওয়া লালের অধীন কলকাতার ইষ্টবেঙ্গল দলকে ৩-০ গোলে পরাজিত করেছিলেন। খেলা শেষে কুমিল্লা নবাব বাড়িতে রাতের ডিনারে একই টেবিলে বসেছিলেন তিনি ও মেওয়া লাল। এসময় মেওয়া লাল তাকে ইষ্টবেঙ্গল ক্লাবে তার সাথে খেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালে কুমিল্লা ষ্টেডিয়ামে ভারতের অপর বিখ্যাত ফুটবল দল কলকাতা মোহামেডানের বিরুদ্ধে খেলায় তৎকালীন কলকাতা মাঠের অপরাজিত গোলরক্ষত ইলিয়াসকে প্রথম মিনিটেই গোল করেছিলেন হুমায়ুন। পরে কলকাতা মোহামেডানের অধিনায়ক সালাম তার পিতাকে (ফরিদ উদ্দিন) অনুরোধ করেছিলেন কলকাতায় ফুটবল খেলার অনুমতি দিতে। তিনি বিখ্যাত ইংলিশ কোচ জন ম্যাকব্রাইড, যাদুকর সামাদ, কলকাতা মোহামেডানের শাহজাহান, কলকাতা মোহামেডানের সাত্তার প্রমূখের কাছেও প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে খেলা শুরু করে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত খেলেছেন।

১৯৫৬ সালের ব্লেজার পরিহিত ছবি

চাকুরীকালীন রেলওয়ের হয়ে ফুটবল খেলাছাড়া সংগঠক, বিভিন্ন গেম এ বিচারকসহ বাংলাদেশ রেলওয়ে ফুটবল দলের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত ২৭ নভেম্বর ২০১৯ ইং ডায়বেটিকস্সহ নানারোগে আক্রান্ত অবস্থায় কুমিল্লা বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি’র নিজ বাড়িতে তিনি ইন্তেকাল করেন। বার্ধক্য অবস্থায় তিনি প্রায়ই পরিবারের সদস্যদের কাছে আক্ষেপ করতেন সারাদেশে ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদানের কথা বলে সরকার কত অখ্যাত লোকজনদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্মাননা কিংবা বাৎসরিক পেনশন বা ভাতা দিলেও তার কপালে জুটেনি কোন পুরস্কার, স্বীকৃতি কিংবা ভাতা।

 

১৯৫৬ সালে ঢাকা ষ্টেডিয়ামে পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী আমজাদ আলী একাদশ বনাম পূর্ব পাকিস্তান চীফ মিনিষ্টার আবুল হোসেন সরকার একাদশ প্রদর্শনী ফুটবল শুরুর আগে প্রধান অতিথি আমজাদ আলীর সাথে হাত মেলাচ্ছেন হুমায়ুন কবীর। পাশে বা থেকে তৎকালীন মন্ত্রী সৈয়দ নান্না মিয়া (একে ফজলুল হকের ভাগিনা), চীফ মিনিষ্টার আবুল আবুল হোসেন সরকার, অর্থমন্ত্রী একাদশের গোলরক্ষক ওয়াজেদ মিয়া, সামসু, কবির। ছবিটি কিংবদন্তী ফটোগ্রাফার আব্দুল মান্নান ওরফে লাডু ভাইয়ের তোলা। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তান হানাদারবাহিনীর হাতে এই ফটোগ্রাফার শহীদ হয়েছিলেন।

 

এ্যালবাম থেকে।

প্রিন্ট করুন