কুমিল্লার গোমতী নদীর দুই পাড়জুড়ে চলছে ভয়াবহ মাটিকাটার মহোৎসব। সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার ও মুরাদনগর উপজেলার অন্তত ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দুই শতাধিক স্পটে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাটি কেটে নিচ্ছে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। প্রশাসন ও গণমাধ্যমের কিছু অংশকে ম্যানেজ করে দিবা-রাত্রি চলে এই অবৈধ বাণিজ্য। এতে হুমকির মুখে পড়েছে গোমতীর বেরীবাঁধ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শীত মৌসুম এলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে এই সিন্ডিকেট। রাত ১০টার পর থেকে এক্সকাভেটর, ট্রাক্টর ও ড্রাম ট্রাকের মিছিল নামে নদীর পাড়ে। মাটি যাচ্ছে পুকুর ও জলাশয় ভরাট, ইটভাটা এবং আবাসিক-বাণিজ্যিক প্লট নির্মাণে। গোমতীর পাড় ও চরের প্রায় ৭০ ভাগ মাটি ব্যবহৃত হচ্ছে ইটভাটায়, বাকি অংশ প্লট ও বাড়ি নির্মাণে।
সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে সদর উপজেলার গোলাবাড়ির আরিফ, খায়ের মেম্বার, পাঁচথুবির রাসেল, শাহাদাত, শালধর ও সামারচরের মোরশেদ, শামীম ও শাহজাহান, ভাটপাড়া ও কাপ্তানবাজারের মাইনুল, রুমান, আমতলীর আলমগীর, দুর্গাপুরের হোসেন মেম্বার, লিটন, মিজান, জুয়েল, দিঘীরপাড়ের ইয়াকুব এবং আড়াইওড়ার জহিরের নাম উঠে এসেছে। বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার ও মুরাদনগরের বিভিন্ন পয়েন্টে আরও বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি এই সিন্ডিকেটের অংশ।
দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ, লক্ষীপুর, চরবাকর, শিবনগর, বড়আলমপুর, বানিয়াপাড়া, খলিলপুর, জয়পুরসহ অন্তত ১৫টি ইটভাটায় প্রতিদিন মাটি সরবরাহ করা হয়। মুরাদনগরের আলীরচর, সাতমোড়া, বোরারচর, ধামঘর, গুঞ্জুরসহ অন্তত ২০টি পয়েন্টে সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত চলে মাটিকাটা। স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মাটিবোঝাই ট্রাক্টর ও ড্রাম ট্রাক চলাচলের জন্য গোমতীর বেরীবাঁধ কেটে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী রাস্তা। এতে বাঁধ ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কোথাও কোথাও সড়ক ভেঙে পড়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, শুষ্ক মৌসুমে যে পরিমাণ মাটি কাটা হয়, বর্ষায় পলি জমেও তার ক্ষতিপূরণ হয় না। ফলে নদীর প্রশস্ততা বেড়ে বাঁধ হুমকির মুখে পড়ে এবং পরিবেশ হারায় ভারসাম্য।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন যেকোনো কার্যক্রম, বিশেষ করে নদীর পাড় বা চর থেকে মাটি কাটা, বেআইনি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (BWDB) আওতাধীন নদীর পাড় বা বাঁধে খনন বা নির্মাণ নিষিদ্ধ। খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও পরিবহন সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া মাটি উত্তোলন ও পরিবহন দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব অপরাধের জন্য জেল ও জরিমানার বিধান থাকলেও বাস্তবে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল। স্থানীয়দের দাবি, গোমতী নদীকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিশেষ প্রতিবেদক :