চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাঁচটি বসতঘরে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানোর ঘটনা তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের চিত্র। পুলিশের তদন্ত ও গ্রেপ্তার আসামিদের স্বীকারোক্তিতে জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে দেশে-বিদেশে অস্থিরতা তৈরির অংশ হিসেবেই এই অগ্নিসংযোগ ঘটানো হয়।
ঘটনার অন্যতম আসামি মনির হোসেন গত সোমবার চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হারুনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেখানে তিনি জানান, তার মায়ের হত্যার বিচার চেয়ে তিনি স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার কাছে গেলে তাকে বলা হয়, বিচার পেতে হলে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।
এরপর মনিরকে রাঙামাটির এক আওয়ামী লীগ নেতা ও পৌর কাউন্সিলরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। তাদের মাধ্যমে মনিরের সঙ্গে কয়েকজন পেশাদার অপরাধীর যোগাযোগ হয়, যারা মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত।
মনির জানান, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর লক্ষ্যে সংখ্যালঘু হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ঘরে আগুন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিনিময়ে তাকে এক লাখ টাকা এবং রাঙামাটি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিনি অশিক্ষিত জানালে তাকে বলা হয়, “হাসিনা ফিরে এলে শিক্ষিত হওয়া লাগবে না।”
অগ্নিসংযোগের আগে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে গোপন বৈঠক হয়। সেখানে পাঁচটি বসতঘরে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। আশ্চর্যজনকভাবে, ওই বৈঠকে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির কয়েকজন মালিকও উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের মধ্যে ১৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিতরণ করা হয়।
মনির আরও জানান, আগুন লাগানোর আগে বাড়ির লোকজনকে সতর্ক করা হতো যাতে কেউ হতাহত না হয় এবং পোষা প্রাণী সরিয়ে নেওয়া যায়। আগুন লাগানো হতো বাড়ির বাইরে পুরনো কাপড় ও লুঙ্গি ব্যবহার করে।
পুলিশ জানায়, গত ডিসেম্বর মাসে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় পাঁচটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ১৮ ডিসেম্বর রাউজানের কেউটিয়া বড়ুয়াপাড়া গ্রামে সাধন বড়ুয়ার বসতঘর ও গোয়ালঘরে আগুন দেওয়া হয়। পরদিন ঢেউয়াপাড়া গ্রামে দুটি হিন্দু বসতঘরে এবং ২৩ ডিসেম্বর পশ্চিম সুলতানপুর গ্রামে সুখ শীল ও অনিলের ঘরে আগুন দেওয়া হয়।
ঘটনাগুলোর পর ঘটনাস্থল থেকে উসকানিমূলক ব্যানার উদ্ধার করা হয়, যাতে সাম্প্রদায়িক উসকানি, রাজনৈতিক নেতাদের নাম ও অর্ধশতাধিক মোবাইল নম্বর লেখা ছিল।
পুলিশ জানায়, প্রতিটি ঘটনায় ঘরবাড়ি ও মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেউ হতাহত হননি। প্রতিটি ঘটনার পরপরই প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা প্রদান করেন।
এ ঘটনায় রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানায় তিনটি মামলা হয়। তবে ঢেউয়াপাড়ার বাসিন্দা বিমল তালুকদার নিজের ঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “গভীর রাতে আগুন লাগার পর বেড়া কেটে পরিবার নিয়ে বের হতে হয়। কেন আগুন দেওয়া হয়েছে, জানি না।”
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আহসান হাবিব পলাশ বলেন, “রাতের আঁধারে এসব অগ্নিসংযোগ ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। এর মাধ্যমে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়।”
গত ২ জানুয়ারি রাঙামাটির কলেজগেট এলাকা থেকে মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন—ওমর ফারুক, কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান ও মো. পারভেজ।
তাদের কাছ থেকে চারটি উসকানিমূলক ব্যানার, দুটি কেরোসিন কনটেইনার, একটি কেরোসিন বোতল, কেরোসিনমাখা লুঙ্গি ও একটি পুরনো কালো শার্ট উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ব্যানারে উল্লেখিত মোবাইল নম্বর সংরক্ষিত একটি মোবাইল ফোন, একটি সিএনজি অটোরিকশা ও একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে, যা ঘটনাস্থলে যাতায়াতে ব্যবহৃত হয়েছিল।
পুলিশ জানায়, ১৫–১৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ঘরে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জড়িত ছিল। জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে ব্যানারে রাজনৈতিক নেতাদের নাম ও ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কিছু মোবাইল নম্বরও যুক্ত করা হয়।
এই ঘটনায় দেশজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

অনলাইন ডেস্ক :