জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা মানছেনা প্রভাবশালীরা
কুমিল্লায় কোনভাবেই পুকুর বা দীঘি ভরাট বন্ধ করা যাচ্ছেনা। প্রভাবশালীরা কখনো অর্থের কখনোবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুকুর ভরাট করছে নিয়মিত। ফলে বিগত সময়ে একে একে হারিয়ে গেছে একদা ট্যাঙ্কের নগরী খ্যাত কুমিল্লার ঝাউতলা, বাগিঁচাগাও, অশোকতলা, গুধুরপুকুর, চর্থার জিনার পুকুর, রাজগঞ্জ, প্রফেসরপাড়া, নতুন চৌধুরীপাড়াসহ কুমিল্লায় অনেক পুকুর দীঘি ছিল। কালের বিবর্তনে এখন অনেক পুকুরই ভরাট হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আবারো প্রভাবশালী চক্র রাজনৈতিক পরিচয়ে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার দূর্গাপুর বা কৃষ্ণনগর এলাকায় প্রায় ৫’শত বছরের পুরনো “বলিনারায়ণ” নামের একটি বিশাল দীঘি ভরাট করে বেচাঁ-কেনার পাশাপাশি ভবন নির্মান অব্যাহত রেখেছে। এক্ষেত্রে জেলা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের বারবার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর কোন সুফল আনছেনা। ফলে প্রতিদিনই দীঘিটির কোথাও মাটি ভরাট বা ভবন তৈরীর কাজ চলছে।

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার দূর্গাপুর উত্তর ইউনিয়নের দুর্গাপুর এলাকায় প্রায় ১০ একর আয়তনের বিশাল দীঘিটির অবস্থান। জায়গার নাম দূর্গাপুর বা কৃষ্ণনগর হলেও “বলি নারায়ণ” দিঘীটির নামে কালের বিবর্তনে এই স্থানটি “দীঘিরপাড়” বলেই পরিচিতি হয়ে উঠে সমগ্র জেলায়। কুমিল্লার সদর উপজেলার দূর্গাপুর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরাতন ট্রাঙ্ক রোডের পাশে বিশাল আকৃতির দীঘির উপস্থিতি সব কিছুকে ছাপিয়ে সুপ্রাচীনকাল থেকেই এলাকাটিকে দীঘিরপাড় হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
১০ একর আয়তনের দীঘিটি সুপ্রাচীনকাল থেকেই এই এলাকার পানিয়-জলের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে হাজার হাজার মানুষের সাংসারিক, গৃহস্থালীসহ নিত্য প্রয়োজনের কাজে ব্যবহার হলেও বর্তমানে ভূমি খেকোরা দীঘির চারপাশজুড়ে ভরাটের উৎসবে মেতে উঠেছে। তাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতেও সাহস না পাওয়ায় অনেকটা নিরবে চলছে এই ভরাট প্রক্রিয়া। এদিকে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে পুকুর ভরাট বন্ধের নির্দেশনার পরও থেমে নেই নির্মান কাজ। দীঘিটি সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য জানা না গেলেও স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ও ভূমি অফিস সুত্র জানায়, নারায়ন নামের এক হিন্দু জমিদার প্রায় ৫’শ বছর আগে দিঘীটি খনন করেছিলেন প্রজাদের পানি সমস্যা সমাধানে।
হিন্দু অধ্যূষিত এই এলাকার লোকজন বিভিন্ন পূজা, পার্বণ এই দীঘির পাড়েই সম্পন্ন করতো। বিভিন্ন দেবতাকে উৎসর্গ করে বলি হতো পাঠা এই দীঘির পশ্চিম পাড়ে। এভাবে “বলি নারায়ণ” দীঘি নামকরণ হয় বলে অনেকের অভিমত। এলাকায় ঘুরে আরো জানা যায়, স্থানীয়ভাবে জনশ্রুতি আছে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা-পার্বণে অনুষ্ঠান করার আগে দীঘির পশ্চিম পাড়ে নানারকমের সাজসজ্জা করতো। এসময় দীঘি থেকে ভেসে উঠতো বিভিন্ন প্রকারের ব্যবহার্য সামগ্রী। পরবর্তীতে ব্যবহারের পর আবারো দীঘিতে রেখে দিলে তলিয়ে যেতো। স্থানীয় একাধিক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুত্র জানান, দীঘিটির কোন সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও তারা বংশ পরম্পরায় জেনে এসেছেন বিগত ৫/৬ পুরুষ ধরে এই এলাকার পানির প্রধান ও একমাত্র উৎস ছিল দীঘিটি।
যেটা পরবর্তীতে যুগ যুগ ধরে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের পানি সমস্যা মিটিয়ে যাচ্ছিল। বর্তমানে দীঘিটির উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে বাসা-বাড়ি এবং দক্ষিণ পাড় এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মান কাজ চলছে পুরোদমে। জলাশয়, পুকুর বা দীঘি ভরাটে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মানছেনা সেটা কেউ। ফলে প্রভাবশালী চক্রটি আর্থিক লাভবান হতে সরকারী নির্দেশনা উপেক্ষা করে দীঘিটির কোথাও মাটি ভরাট করছে, আবার কোথাও নির্মান করছে ভবন। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ জেলা প্রশাসনের কাছে স্থানীয়রা বেশ কিছু উড়ো চিঠি দিলে জেলা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সরেজমিন এসে মাটি ভরাট বন্ধে স্থানীয় তহসিল অফিসকে নির্দেশনা দেয়।
এর প্রেক্ষিতে গত দু’মাস নির্মান বা মাটি ভরাট বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি আবারো দিঘীটির উত্তর পাড়ে ভবন নির্মান করছে একটি চক্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সুত্র জানায়, দীঘিটির মালিক বর্তমানে প্রায় ৪১ জন। আর্থিকসহ নানা কারণে মালিক পক্ষের কেউ না কেউ বিক্রি করে দিচ্ছে তাদের অংশ বিশেষ। এরপর নতুন ক্রেতারা ভরাট করে ভবন নির্মানের কাজ করছেন। ভরাট কাজে বিক্রেতারা সহযোগীতা করছে বলে নিরিহ সাধারণ মানুষ এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোন প্রতিবাদও করতে পারছেনা।
এক সময়ের ট্যাঙ্ক এর শহর নামে পরিচিত কুমিল্লায় প্রতিনিয়তই ভরাট হচ্ছে এভাবে একের পর এক পুকুর বা দীঘি। আর এতে পুকুর শূণ্য হচ্ছে জেলার বিভিন্ন এলাকা। সুত্র জানায়, দীঘিটিতে দীর্ঘকাল ধরে স্থানীয়দের ব্যবহারের পাশাপাশি মাছ চাষ হতো। দীঘিটি বর্তমানে মাছ শুণ্য। সুত্র আরো জানায়, এরইমাঝে দীঘিটির উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ের অনেকটাই অংশ মালিকানা বদল হয়ে গেছে। দক্ষিণ পাড়ে আলেকজান মেমোরিয়াল স্কুল-কলেজ এর নতুন ভবনের কাজ ও বাকী ৩ পাড়ে চলছে ভরাটসহ ভবন নির্মানের উৎসব। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পুকুর, দীঘি, নালা, ডোবা বা জলাশয় ভরাট নিষিদ্ধ হলেও এখানে কেউ সেটা মানছেনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সুত্র আরো জানায়, দীঘিটি ভরাটের খবর পেয়ে প্রশাসনের অনেক কর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে থেমে নেই নির্মান কাজ।
কুমিল্লার অন্যতম বিশাল দীঘিটি ভরাটের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সামসুল আলম ২৩ মার্চ বিকেলে কুমিল্লার ডাককে বলেন, ইতিপূর্বে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সত্যতা পেয়ে আলেকজান স্কুল এন্ড কলেজসহ ৫ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আলেকজান স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ, আলমগীর হোসেন, খোকন মিয়া, শাহ আলম ও ইয়াকুব আলীকে কারণ দর্শাও নোটিশ করেছিলাম। আমি বিষয়টি আপনার কাছ থেকে শুনলাম। দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।
শনিবার (২৩ মার্চ) বিকেলে বিষয়টি জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক আবুল ফজল মীর বলেন, আমি এখনই দীঘি ভরাট বন্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :