কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি ইউনিয়নের সমেশপুর গ্রামে গোমতীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ঘেঁষে ঠিকাদারের লোকজন গভীরভাবে মাটি কাটতে থাকায় গ্রামবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, আসন্ন বর্ষায় বাঁধ ভেঙ্গে গেলে আবারও লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়বে এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অফিস, কলকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র তলিয়ে যাবে।
২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও কুমিল্লা সদরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের একাধিক অংশ ভেঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ, ইউনিয়ন পরিষদ অফিস, স্থানীয় স্কুল-কলেজ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বাজার প্লাবিত হয়। বুড়িচংয়ের একাধিক গার্মেন্টস কারখানা ও খাদ্য গুদাম পানিতে ডুবে গিয়ে কোটি টাকার ক্ষতি হয়। হাজার হাজার একর ফসলী জমি ও গবাদি পশু ভেসে যায়। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকেই স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, বাঁধের পাশে আবারও গভীরভাবে মাটি কাটলে একই ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
স্থানীয় কৃষক রুহুল আমিন বলেন, “গতবার বাঁধ ভেঙ্গে আমাদের ফসল, গবাদি পশু সবকিছু পানিতে ভেসে গিয়েছিল। এবারও যদি বাঁধ ভেঙ্গে যায়, আমরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবো না।” কৃষক দেলোয়ার জানান, “আমরা নিজেরা স্বেচ্ছাশ্রমে বস্তায় মাটি ভরে বাঁধ রক্ষা করেছি। কিন্তু এবার ঠিকাদারের লোকজন বাঁধের কোল ঘেঁষে ২৫-৩০ ফুট গভীর মাটি কেটে নিচ্ছে। এতে বাঁধ ভেঙ্গে গেলে আমাদের জীবন-জীবিকা ধ্বংস হয়ে যাবে।”
কৃষক আলী আহম্মেদ বলেন, “আমরা চাই বাঁধের এক/দেড়’শ গজ ভিতর থেকে মাটি কেটে সংস্কার করা হোক। কিন্তু বাঁধের কোল ঘেঁষে মাটি কাটার বিষয়টি রহস্যজনক।” প্রতিবাদে অংশ নেওয়া অনেকেই হুমকির ভয়ে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তারা অভিযোগ করেন, বাঁধ সংস্কারের নামে চর থেকে খনন করা মাটির একটি অংশ বাইরে বিক্রি করছে ঠিকাদারের লোকজন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয়দের আলোচনায় কাঁঠালিয়া এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য সরকারি জমি থেকে ৫ ফুট গভীরতায় মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ঠিকাদার প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয়দের পাত্তা না দিয়ে ২৫-৩০ ফুট গভীর করে মাটি কেটে নিচ্ছে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী শরিফুল হক মোল্লা বলেন, “কাঁঠালিয়ায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য সরকারি ব্যয় কমিয়ে আমাদের সরকারি জমি থেকে ৫ ফুট মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঠিকাদাররা নিয়ম ভেঙ্গে গভীরভাবে মাটি কাটছে। আমি এখনই লোক পাঠিয়ে কাজ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা নিচ্ছি।” তিনি আরও বলেন, “ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম মুখস্থ নেই। তবে কুষ্টিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ চলছে এবং স্থানীয় ঠিকাদাররা তা বাস্তবায়ন করছে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আশরাফ বলেন, “এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। আসন্ন বন্যার আগেই কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি খুঁজ খবর নেওয়ার জন্য একজন আইনজীবী ও মুহুরি সহ সর্দার মাতব্বরদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে ৫ ফুটের বেশি মাটি না কাটা হয়। স্থানীয়রা যদি বাঁধা দেন, আমরা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবো। তবুও আমি ওই এলাকায় অফিস থেকে লোক পাঠিয়ে বিষয়টি দেখছি।”
গ্রামবাসীর দাবি, আসন্ন বর্ষায় বাঁধ ভেঙ্গে গেলে আবারও লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়বে এবং কুমিল্লার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক :