লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার মা ও তার তিন কন্যাকে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার নিজ পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) রাত প্রায় ১০টায় জানাজার নামাজ শেষে উপজেলার পৌরসভার নটিয়া এলাকার স্থানীয় কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।
দাফনের আগে নিহতদের মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের আহাজারি ও কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষ শেষবারের মতো তাদের দেখতে ভিড় করেন। অনেকের মুখেই ছিল এক প্রশ্ন, “নিষ্পাপ শিশুদের অপরাধ কী ছিল?”
এ সময় পরিবারের একমাত্র জীবিত সন্তান জুনায়েদ হোসেন সিফাতের কান্না উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বারবার বলছিলেন, “এখন আমাকে কে দেখবে? সাত বছর আগে বাবাকে হারিয়েছি। মা আর বোনদের নিয়েই বাঁচার স্বপ্ন ছিল। আজ সবাই চলে গেল।”
জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা নদীপাড় সড়কের একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলার বাসায় ঢুকে শাহিনুর বেগম (৩৮), তার মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) ও ফাতেমা আক্তার শিফাকে (১০) ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের চিৎকার শুনে প্রতিবেশী আফরোজা বেগম রানী জানালা দিয়ে সন্দেহজনক এক ব্যক্তিকে দেখতে পান এবং বাইরে থেকে ভবনের গেট বন্ধ করে দেন। পরে স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে গিয়ে চারজনের রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান। অভিযুক্ত ব্যক্তি ভবনের ছাদ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে উত্তেজিত জনতা তাকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার আগে একই ভবনের পঞ্চম তলায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন। বাসাভাড়ার কিছু টাকা ও স্বর্ণালংকার নিহত শাহিনুর বেগমের কাছে জমা ছিল বলে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে ডাকাতির উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হলেও প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
এ ঘটনায় পরিবারের একমাত্র ছেলে জুনায়েদ হোসেন সিফাত বাদী হয়ে শুক্রবার দুপুরে রায়পুর থানায় একটি এজাহার দায়ের করেছেন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
নিহতদের জানাজার নামাজ পরিচালনা করেন মাওলানা সামসুল হক আরেফি। জানাজায় উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান মোল্লা, উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ইব্রাহিমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিপুল সংখ্যক মুসল্লি অংশ নেন।
এ মর্মান্তিক ঘটনায় হোমনাসহ পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়রা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

মোঃ তারিকুল ইসলাম (তারেক), স্টাফ রিপোর্টার