প্রিন্ট এর তারিখঃ সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩

পিতার স্বপ্ন পূরণে অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার

অনলাইন ডেস্ক

মাতৃহারা শৈশব থেকে কুমিল্লা আদালতের পরিচিত মুখ—সংগ্রাম, সাংবাদিকতা ও আইন পেশায় এক অনন্য পথচলা

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : সাংবাদিক হাবিবুর রহমান খাঁন, নিজস্ব প্রতিবেদক
সাক্ষাৎকার প্রদান: অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার

মানুষের জীবনের কিছু গল্প শুধু সাফল্যের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে হারানোর বেদনা, ভালোবাসা, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও স্বপ্নপূরণের ইতিহাস। জীবনের শুরুতেই প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও যারা থেমে যান না, তাঁদের পথচলা হয়ে ওঠে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার।

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকারের জীবনও তেমনই এক সংগ্রামী পথচলার গল্প।

শৈশবেই মাকে হারিয়েছেন তিনি। মাতৃস্নেহের অপূরণীয় শূন্যতা নিয়ে একমাত্র মামা ও দিদিমার স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে উঠেছেন। তাঁদের কাছে থেকেই পড়াশোনা করে ১৯৯৫ সালে চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর কুমিল্লায় বাবার কাছে এসে শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়।

তাঁর বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সহকারী সমিতির একজন সিনিয়র সদস্য ছিলেন। বাবার স্বপ্ন ছিল—ছেলে একদিন আইনজীবী হবে। ধীরে ধীরে বাবার সেই স্বপ্নই তাপস চন্দ্র সরকারের নিজের স্বপ্নে পরিণত হয়।

কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগেই ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার। বাবাকে হারানোর শোকের মধ্যেও থেমে যাননি তাপস। বরং বাবার অসমাপ্ত স্বপ্নকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে এগিয়ে যান।

অবশেষে ২০১৬ সালের ১৪ মে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে সনদ লাভ করেন তিনি। একই বছরের ৯ জুন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর আইনজীবী জীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা।

বাবার স্বপ্ন পূরণ হলো, কিন্তু সেই স্বপ্নের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সাক্ষী—বাবা—তখন আর পৃথিবীতে নেই।

শৈশবের বেদনা, মামা-দিদিমার ভালোবাসা, বাবার স্বপ্ন, সাংবাদিকতা, আইন পেশা, পরিবার ও সামাজিক কর্মকাণ্ডসহ জীবনের নানা চড়াই-উতরাই নিয়ে সাংবাদিক হাবিবুর রহমান খাঁনের সঙ্গে কথা বলেছেন অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার।

 

শৈশব ও মাতৃহারা হওয়ার গল্প

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : তাপস ভাই, শুরুতেই আপনার শৈশবের কথা জানতে চাই। আপনার জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় সম্পর্কে বলুন।

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : আমার জন্ম ১৯৮০ সালের ৫ এপ্রিল। আমার বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার এবং মা যোগমায়া সরকার। জন্মের পর খুব বেশিদিন মায়ের স্নেহ পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। খুব ছোটবেলাতেই আমি মাকে হারাই।

একটি শিশুর জীবনে মা কী—সেটা হয়তো তখন পুরোপুরি বুঝিনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাকে হারানোর শূন্যতাটা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। জীবনের অনেক আনন্দের মুহূর্তে মনে হয়েছে, মা যদি আজ থাকতেন, তাহলে হয়তো এই আনন্দটা আরও পূর্ণ হতো। মায়ের মুখের স্মৃতির চেয়ে তাঁকে না পাওয়ার শূন্যতাই যেন বেশি মনে আছে।

হাবিবুর রহমান খাঁন : মাকে হারানোর পর আপনার শৈশব কীভাবে কেটেছে?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : আমার একমাত্র মামা ও দিদিমা আমাকে অনেক স্নেহ-মমতা দিয়ে বড় করেছেন। তাঁদের কাছে আমি শুধু আশ্রয় পাইনি, পেয়েছি ভালোবাসা, শাসন ও জীবনের প্রথম দিকের শিক্ষা।

মায়ের জায়গা কেউ নিতে পারে না। কিন্তু তাঁরা আমাকে কখনো ভালোবাসার অভাব অনুভব করতে দেননি। আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, জীবনের কঠিন সময়ে মামা ও দিদিমা আমার জন্য সৃষ্টিকর্তার দেওয়া আশীর্বাদ ছিলেন। তাঁদের অবদান কোনোদিন ভুলতে পারব না।

হাবিবুর রহমান খাঁন : মাতৃহারা শৈশব আপনার ব্যক্তিত্বে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : জীবনের শুরুতেই কিছু হারানোর অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়। আমি খুব ছোট বয়সেই বুঝেছি, জীবনে সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো পাওয়া যায় না। কিছু শূন্যতা নিয়েই মানুষকে পথ চলতে হয়।

মায়ের অনুপস্থিতি আমাকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু সেই কষ্ট আমাকে দুর্বল করে দেয়নি। বরং ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে, মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছে এবং জীবনের ছোট ছোট ভালোবাসার মূল্য উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে।

 

শিক্ষাজীবন ও বাবার কাছে ফিরে আসা

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : আপনার শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কোথায় কেটেছে?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : মায়ের মৃত্যুর পর মামা ও দিদিমার কাছে থেকেই আমার শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে। চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। ১৯৯৫ সালে সেখান থেকে এসএসসি পাস করি।

এরপর এসএসসি পাস করে কুমিল্লায় বাবার কাছে চলে আসি। এটা আমার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছোটবেলায় মাকে হারানোর পর মামা ও দিদিমার কাছে বড় হয়েছিলাম। এরপর বাবার কাছে এসে তাঁর স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে ওঠার সুযোগ পাই।

হাবিবুর রহমান খাঁন : এরপর আপনার পড়াশোনা কীভাবে এগিয়েছে?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : ১৯৯৭ সালে কুমিল্লা অজিত গুহ মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাস করি। এরপর ২০০০ সালে নিমসার জুনাব আলী ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করি। পরবর্তীতে কুমিল্লা আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করি।

আইন পড়ার ক্ষেত্রে বাবার স্বপ্ন ও অনুপ্রেরণা আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

 

বাবার স্বপ্নই হয়ে ওঠে নিজের স্বপ্ন

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : আপনার বাবা আপনাকে নিয়ে কী ধরনের স্বপ্ন দেখতেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : আমার বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সহকারী সমিতির একজন সিনিয়র সদস্য ছিলেন। আইন অঙ্গনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। তিনি চাইতেন আমি একদিন আইনজীবী হই।

বাবার সেই ইচ্ছাটা ধীরে ধীরে আমার নিজের স্বপ্ন হয়ে যায়। আমি মনে করতে শুরু করি, আইন পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে বাবার স্বপ্ন পূরণ হবে।

হাবিবুর রহমান খাঁন : বাবার ইচ্ছাকে নিজের জীবনের লক্ষ্য হিসেবে কীভাবে গ্রহণ করলেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : বাবার সঙ্গে থাকতে থাকতে তাঁর স্বপ্নটা আমার মধ্যে গভীরভাবে জায়গা করে নেয়। তিনি চাইতেন আমি আইন পড়ি, আইনজীবী হই এবং মানুষের পাশে দাঁড়াই।

আমি তখন বুঝতে শুরু করি, বাবা শুধু আমার একটি পেশা চাননি; তিনি চেয়েছিলেন আমি এমন একটি জায়গায় দাঁড়াই, যেখান থেকে মানুষের উপকার করা যায়। সেই জায়গা থেকেই আইন পড়ার প্রতি আমার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।

 

সাংবাদিকতা থেকে আইন পেশায়

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : আইন পেশায় আসার আগে আপনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন।

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : সাংবাদিকতা আমার জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।

সাংবাদিকতার কারণে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মিশেছি। মানুষের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা, অধিকার, সামাজিক অসঙ্গতি এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা খুব কাছ থেকে দেখেছি।

সাংবাদিকতা আমাকে মানুষের কথা শুনতে শিখিয়েছে। মানুষের সমস্যা শুধু সংবাদ হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে অনুভব করতে শিখিয়েছে।

হাবিবুর রহমান খাঁন : সাংবাদিকতা থেকে আইন পেশায় আসার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ ছিল?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : সাংবাদিকতা করতে গিয়ে উপলব্ধি করি, মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাংবাদিক হিসেবে অন্যায় তুলে ধরা যায়, মানুষের কথা বলা যায়। কিন্তু একজন আইনজীবী হিসেবে মানুষের অধিকার রক্ষায় আরও সরাসরি ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

এর সঙ্গে বাবার স্বপ্ন তো ছিলই। নিজের আগ্রহ এবং বাবার স্বপ্ন—এই দুই বিষয় আমাকে আইন পেশায় আসতে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।

 

বাবাকে হারিয়েও থেমে যাননি

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : আপনার বাবা কখন মৃত্যুবরণ করেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : আমার বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। বাবাকে হারানোর কষ্ট আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর একটি।

তবে বাবাকে হারানোর সময় আমার আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন তখনো পূর্ণ হয়নি। তাই বাবাকে হারানোর বেদনার সঙ্গে আরও একটি আক্ষেপ যুক্ত হয়েছিল—যে মানুষটি আমাকে আইনজীবী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, তিনি নিজ চোখে সেই দিনটি দেখে যেতে পারলেন না।

হাবিবুর রহমান খাঁন : বাবার মৃত্যুর পর তাঁর স্বপ্ন পূরণের তাগিদ কি আরও বেড়ে যায়?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : অনেক বেড়ে যায়। বাবা চলে যাওয়ার পর আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—বাবা নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্নটা তো আছে। সেই স্বপ্ন আমাকে পূরণ করতেই হবে।

আমি মনে করতাম, বাবার জন্য আমার সবচেয়ে বড় কিছু করার থাকলে সেটা হবে তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। তখন থেকে আইনজীবী হওয়ার লক্ষ্যটা আমার কাছে শুধু নিজের ক্যারিয়ারের বিষয় ছিল না; এটা বাবার প্রতি আমার দায়িত্বও হয়ে যায়।

 

স্বপ্নপূরণের দিন

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : শেষ পর্যন্ত কবে আপনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদ পান?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : ২০১৬ সালের ১৪ মে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে সনদপ্রাপ্ত হই। এরপর একই বছরের ৯ জুন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগ দিই।

আমার জীবনের জন্য দিন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আনন্দ ছিল, গর্ব ছিল, স্বপ্ন পূরণের অনুভূতি ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে একটা গভীর শূন্যতাও ছিল। কারণ, যার স্বপ্ন পূরণ হলো, সেই মানুষটি তখন আর পাশে নেই।

হাবিবুর রহমান খাঁন : সনদ হাতে পাওয়ার মুহূর্তে বাবার কথা কি মনে পড়েছিল?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : খুব বেশি মনে পড়েছিল। সেদিন মনে হচ্ছিল—বাবা যদি আজ থাকতেন! হয়তো সবার আগে তাঁকেই সনদটা দেখাতাম। হয়তো তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরতেন। হয়তো বলতেন, ‘তুই পেরেছিস।’

কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাবা তখন আর পৃথিবীতে নেই। তাই সেদিনের আনন্দের সঙ্গে বাবাকে হারানোর কষ্টও মিশে ছিল।

হাবিবুর রহমান খাঁন : আজ আদালতে দাঁড়িয়ে যখন কাজ করেন, তখন বাবাকে কীভাবে অনুভব করেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : বাবার কথা মনে পড়ে। বিশেষ করে যখন আইনজীবীর পোশাক পরে আদালতে দাঁড়াই, তখন মনে হয়—এই জায়গায় দাঁড়ানোর পেছনে বাবার স্বপ্ন ছিল।

আমি জানি না, পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পর মানুষ তার প্রিয়জনদের দেখতে পান কি না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতে ভালোবাসি—বাবা কোথাও থেকে আমাকে দেখছেন। আর হয়তো মনে মনে বলছেন—‘তুই আমার স্বপ্নটা পূরণ করেছিস।’ এই বিশ্বাসটাই আমাকে অনেক শান্তি দেয়।

 

সাংবাদিকতা ও আইন পেশার সম্পর্ক

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : সাংবাদিকতা ও আইন পেশার মধ্যে আপনি কী ধরনের সম্পর্ক খুঁজে পান?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : দুটো পেশার কাজ আলাদা হলেও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের জায়গায় অনেক মিল রয়েছে।

সাংবাদিক হিসেবে মানুষের কথা শুনেছি, তাঁদের সমস্যা তুলে ধরেছি। আইনজীবী হিসেবে মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি।

সাংবাদিকতা আমাকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছে। আইন পেশা আমাকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছে। তাই আমার কাছে এই দুই পেশা জীবনের দুটি আলাদা অধ্যায় হলেও পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

 

পৈতৃক শেকড় ও বর্তমান জীবন

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : আপনার পৈতৃক বাড়ি কোথায় এবং বর্তমানে কোথায় বসবাস করছেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : আমাদের পৈতৃক বসতবাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার লামচরী উকিল বাড়ী এলাকায়। আমার পারিবারিক শেকড়ের সঙ্গে এই জায়গার সম্পর্ক গভীর। অনেক স্মৃতি এই এলাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

অন্যদিকে কর্মজীবনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লার কালিয়াজুরী এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছি। কুমিল্লা এখন আমার কর্মজীবন, পরিবার এবং সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

পরিবার

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : আপনার পারিবারিক জীবন সম্পর্কে জানতে চাই।

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : আমার এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। আমার জীবনসঙ্গিনী রিতা রাণী মজুমদার পরিবারের ক্ষেত্রে সবসময় আমার পাশে রয়েছেন।

পরিবার আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি। তাই পরিবারের ভালোবাসা ও নিরাপত্তার মূল্য আমি খুব ভালোভাবে বুঝি। আমি চাই আমার সন্তানরা যেন কখনো ভালোবাসার অভাব অনুভব না করে। তাদের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই আমার অন্যতম দায়িত্ব।

হাবিবুর রহমান খাঁন : আপনার শৈশবের অভিজ্ঞতা কি সন্তানদের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছে?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : অবশ্যই। আমি জানি, একটি শিশুর জীবনে মা-বাবার উপস্থিতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমি চাই আমার সন্তানরা যেন ভালোবাসার মধ্যে বড় হয়।

আমার নিজের জীবনের না-পাওয়াগুলো আমাকে সন্তানদের পাওয়ার মূল্য বুঝিয়েছে। তাদের জীবনে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও পরিবারের বন্ধন নিশ্চিত করতে চাই।

 

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও আপনাকে সম্পৃক্ত থাকতে দেখা যায়। এ বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : আমি মনে করি, একজন মানুষের পরিচয় শুধু তাঁর পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজের প্রতিও আমাদের দায়িত্ব আছে।

মানুষের সঙ্গে থাকা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা এবং মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো—এসবের মধ্যেই আমি এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পাই। মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাস আমার কাছে অনেক বড় অর্জন।

 

জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কী বলে মনে করেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : আমার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—আমি বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। আমি আইনজীবী হয়েছি। বাবা যেটা চেয়েছিলেন, সেটা করতে পেরেছি।

বাবা নেই—এটা আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট। কিন্তু তাঁর স্বপ্নটা আমি পূরণ করতে পেরেছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় শান্তি।

হাবিবুর রহমান খাঁন : জীবনের সবচেয়ে বড় না-পাওয়া কী?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : মা-বাবাকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে পাশে না পাওয়া।

মাকে খুব ছোটবেলায় হারিয়েছি। আর বাবাকে হারিয়েছি এমন একটি সময়ে, যখন তাঁর স্বপ্ন পূরণের একেবারে কাছাকাছি ছিলাম। বাবা যদি আর কয়েক বছর বেঁচে থাকতেন, হয়তো আমার জীবনের অনেক আনন্দ তাঁর সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারতাম। এটাই আমার সবচেয়ে বড় আফসোস।

 

প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : এত প্রতিকূলতার পরও কীভাবে নিজেকে সামলে রেখেছেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : জীবনের কষ্ট আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে—থেমে গেলে চলবে না। মানুষ জীবনে অনেক কিছু হারায়। কিন্তু হারানো জিনিসের জন্য সারাজীবন থেমে থাকলে সামনে এগোনো সম্ভব নয়।

আমি চেষ্টা করেছি কষ্টকে শক্তিতে পরিণত করতে। মাকে হারানোর কষ্ট, বাবাকে হারানোর বেদনা—এসব আমার সঙ্গে আছে। কিন্তু এগুলো আমাকে দুর্বল না করে বরং আরও দায়িত্বশীল করেছে।

 

নতুন প্রজন্মের প্রতি বার্তা

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : আপনার জীবন থেকে নতুন প্রজন্মের জন্য কী বার্তা দিতে চান?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : জীবনে যত প্রতিকূলতাই আসুক, কখনো হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে। পরিশ্রম করতে হবে। সততা ধরে রাখতে হবে।

আর মা-বাবা যদি কোনো স্বপ্ন দেখেন, সেই স্বপ্নের মূল্য দিতে হবে। জীবনের পথ সবসময় মসৃণ হবে না। কিন্তু কঠিন পথ পেরিয়েই অনেক সময় মানুষ তার সবচেয়ে সুন্দর গন্তব্যে পৌঁছায়।

 

বাবার উদ্দেশে শেষ কথা

 

হাবিবুর রহমান খাঁন : আপনার বাবা যদি আজ আপনার সামনে বসে থাকতেন, তাঁকে কী বলতেন?

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার : বলতাম—বাবা, তুমি যে স্বপ্ন দেখেছিলে, আমি সেটা পূরণ করার চেষ্টা করেছি। তুমি চেয়েছিলে তোমার ছেলে আইনজীবী হবে। আজ আমি আইনজীবী।

তুমি নেই—এটাই আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট। তুমি যদি আজ থাকতে, তাহলে হয়তো আমার সবচেয়ে বড় আনন্দটা তোমার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারতাম।

আমি তোমাকে বলতে চাইতাম—বাবা, তুমি যে স্বপ্নটা আমার চোখে এঁকেছিলে, আমি সেটা ভুলিনি। তুমি চলে গেছ, কিন্তু তোমার স্বপ্নটা আমার সঙ্গে রয়ে গেছে।

আজ আমি যখন আদালতে দাঁড়াই, তখন মনে হয়—তুমি হয়তো কোথাও থেকে আমাকে দেখছ। আর আমি শুধু মনে মনে বলি—বাবা, তোমার স্বপ্নটা আমি পূরণ করেছি।

 

প্রতিবেদকের শেষকথা

 

অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকারের জীবন কেবল একজন আইনজীবীর পেশাগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি এক মাতৃহারা শিশুর বেড়ে ওঠা, মামা-দিদিমার ভালোবাসা, একজন বাবার স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন পূরণে এক সন্তানের অঙ্গীকারের গল্প।

১৯৮০ সালের ৫ এপ্রিল জন্ম নেওয়া তাপস চন্দ্র সরকার জীবনের শুরুতেই মাকে হারিয়েছেন। মামা ও দিদিমার স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে উঠে ১৯৯৫ সালে ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর কুমিল্লায় বাবার কাছে এসে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যান। ১৯৯৭ সালে এইচএসসি, ২০০০ সালে স্নাতক এবং পরবর্তীতে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।

সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু করেন তিনি। মানুষের কথা শুনেছেন, মানুষের সমস্যা ও সামাজিক অসঙ্গতি কাছ থেকে দেখেছেন এবং সংবাদকর্মী হিসেবে সেগুলো তুলে ধরেছেন। পরবর্তীতে সেই অভিজ্ঞতাই আইন পেশায় মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করার ক্ষেত্রে তাঁকে অনুপ্রাণিত করে।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়টি বাবার স্বপ্নকে ঘিরে।

বাবা নিখিল চন্দ্র সরকার চেয়েছিলেন তাঁর ছেলে আইনজীবী হবে। তাপস সেই স্বপ্নকে নিজের স্বপ্নে পরিণত করেন। কিন্তু ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি বাবার মৃত্যু তাঁর জীবনে বড় শূন্যতা তৈরি করে। সন্তানের আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন পূরণ দেখে যেতে পারেননি বাবা।

তারপরও থেমে যাননি তাপস চন্দ্র সরকার। বাবার স্বপ্নকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিয়ে এগিয়ে যান। ২০১৬ সালের ১৪ মে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে সনদ অর্জন করেন এবং একই বছরের ৯ জুন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগ দেন।

স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল, কিন্তু স্বপ্নদ্রষ্টা বাবা তখন পাশে ছিলেন না।

আজ কুমিল্লা আদালতে আইনজীবীর পোশাকে দাঁড়ালে তাঁর সঙ্গে যেন দাঁড়িয়ে থাকে জীবনের দীর্ঘ পথচলা—মায়ের স্মৃতি, মামা-দিদিমার ভালোবাসা, বাবার স্বপ্ন, সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম।

মানুষ চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসা থেকে যায়। মানুষ হারিয়ে যায়, কিন্তু স্বপ্ন থেকে যায়। আর কখনো কখনো সেই স্বপ্ন সন্তানের সাফল্যের মধ্য দিয়ে নতুন জীবন পায়।

নিখিল চন্দ্র সরকারের স্বপ্ন আজ তাঁর সন্তান অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকারের পেশাগত পরিচয়ের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছে।

 

বাবা নেই, কিন্তু বাবার স্বপ্ন আছে।
মা নেই, কিন্তু মায়ের স্মৃতি আছে।
আর সেই স্মৃতি ও স্বপ্নকে হৃদয়ে ধারণ করেই এগিয়ে চলেছেন অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার।

প্রিন্ট করুন