প্রিন্ট এর তারিখঃ শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩

১৫ লাখ টাকায় আপস, বাদী খুশি—একাধিক গুরুতর অভিযোগের পরও বহাল চিকিৎসক!

শাহনাজ বেগম এ্যানি :

কুমিল্লায় প্রসূতি রোগীর পেটে গজ/কাপড় রেখে সেলাই করার অভিযোগে করা মামলায় বাদী পক্ষ ১৫ লাখ টাকা গ্রহণের পর আপস করেছেন বলে জানা গেছে। এদিকে একই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অতীতেও চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল গ্রুপের রক্ত প্রয়োগ ও নবজাতকের মৃত্যুসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ ও মামলা থাকার তথ্য সামনে এসেছে। এসব ঘটনার পরও অভিযুক্ত চিকিৎসক বহাল থাকায় প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে।

২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড় এলাকার রামঘাটলা মিডল্যান্ড হসপিটালে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কটপাড়া গ্রামের মজুমদার বাড়ির প্রসূতি মাকসুদা আক্তারের সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, সিজারিয়ান অপারেশনের সময় তার পেটে গজ/কাপড় রেখে সেলাই করে দেওয়া হয়। একই সময়ে তার জরায়ু অপসারণ করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে।

অপারেশনের পর মাকসুদা আক্তার কয়েক মাস ধরে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগতে থাকেন। একপর্যায়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে তার সমস্যাটি শনাক্ত হয়। পরে পুনরায় অস্ত্রোপচার করে পেট থেকে গজ/কাপড় বের করা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

ঘটনার পর মাকসুদার বাবা মো. এনামুল হক মজুমদার বাদী হয়ে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। মামলাটি সি.আর. ৬৭৩/২০২৬ হিসেবে নথিভুক্ত হয়। মামলায় চিকিৎসক ডা. নাজনীন জাহান লুবনার বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলা ও মেয়ের জীবন বিপন্ন করার অভিযোগ এনে বিচার দাবি করা হয়।

মামলাটি আমলে নিয়ে আদালত কুমিল্লার সিভিল সার্জনকে ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দাখিল করে। তদন্ত প্রতিবেদনে প্রসূতি রোগীর পেটে গজ/কাপড় রেখে সেলাই করার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে চিকিৎসক ডা. নাজনীন জাহান লুবনা ও সংশ্লিষ্ট মিডল্যান্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আদালত অভিযুক্ত চিকিৎসককে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে অভিযোগের বিষয়ে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেন।

 

১৫ লাখ টাকায় আপস

 

এদিকে মামলার বাদী মো. এনামুল হক মজুমদার ১৫ লাখ টাকা গ্রহণের পর অভিযুক্ত পক্ষের সঙ্গে আপস করেছেন বলে জানা গেছে। এর ফলে মামলাটি আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির পথে এগিয়েছে।

অভিযোগ ও মামলার বিষয়ে বাদী এনামুল হক মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আদালত থেকে তথ্য নেওয়ার কথা বলেন। পরে ব্যস্ততার কথা জানিয়ে এ বিষয়ে কথা বলতে পারবেন না বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

 

পুরোনো মামলাতেও আপসের তথ্য

 

অনুসন্ধানে ডা. নাজনীন জাহান লুবনার বিরুদ্ধে অতীতেও চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব মামলার কয়েকটিও পরবর্তীতে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে আপস করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো আদালতের চূড়ান্ত রায়ে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

২০২৩ সালের মার্চ মাসে একই মিডল্যান্ড হাসপাতালে রোগীকে ভুল গ্রুপের রক্ত দেওয়ার একটি গুরুতর অভিযোগও ওঠে।

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার পাঁচথুবী গ্রামের রফিকুল ইসলামের স্ত্রী হাসিনা আক্তার জরায়ুর সমস্যার চিকিৎসার জন্য মিডল্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি হন। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তার রক্তের গ্রুপ ছিল ‘ও পজিটিভ’। কিন্তু অস্ত্রোপচারের সময় ভুলবশত তাকে ‘বি পজিটিভ’ রক্ত দেওয়া হয়।

পরিবারের দাবি, ভুল গ্রুপের রক্ত শরীরে প্রবেশের পর হাসিনা আক্তার অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকার পিজি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে স্থানান্তর করা হয়।

এ ঘটনায় ২০২৩ সালের ৩০ মার্চ হাসিনা আক্তারের স্বামী রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে ডা. নাজনীন জাহান লুবনাসহ মিডল্যান্ড হাসপাতালের মোট আটজনের বিরুদ্ধে কুমিল্লার আদালতে মামলা করেন। পরবর্তীতে মামলাটি আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

 

বক্তব্য পাওয়া যায়নি চিকিৎসকের

 

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডা. নাজনীন জাহান লুবনার চেম্বারে একাধিকবার গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তার অবস্থান জানাতে রাজি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরে তার মোবাইল ফোনে কয়েক দিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

 

‘বিএমডিসি ব্যবস্থা নেয়’

 

একাধিক চিকিৎসা-সংক্রান্ত অভিযোগ ও মামলা থাকা সত্ত্বেও সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়ে কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. জহিরুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয়।

তিনি জানান, এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সাধারণত বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। তবে তিনি কুমিল্লায় নতুন যোগদান করেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। সবকিছু জেনে তিনি জানাবেন বলেও জানান।

প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

একটি ঘটনায় আদালতের নির্দেশে করা তদন্তে চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করার তথ্য, অন্যদিকে অতীতের একাধিক গুরুতর অভিযোগ ও মামলা—সব মিলিয়ে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রশাসনিক বা পেশাগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

১৫ লাখ টাকার আপসের মাধ্যমে বর্তমান মামলার বিরোধ মিটে গেলেও চিকিৎসা ব্যবস্থায় রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসকের জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে প্রশ্নগুলো থেকেই যাচ্ছে।

প্রিন্ট করুন