প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

কুমিল্লায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন, ২ হাজার ৫০০ মানুষের নিরাপত্তায় একজন পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক :

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জনপদ কুমিল্লায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত ১০ মাসে জেলায় ১২০টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য সামনে আসায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সীমিত জনবল, অপরাধ প্রতিরোধে গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিয়মিত নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা চলছে।

গত কয়েক মাসে ছিনতাইয়ের ঘটনায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম এবং স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এসব ঘটনায় মহাসড়ক ও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠেছে।

জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভার তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ মাসে কুমিল্লায় ১২০টি হত্যাকাণ্ড, ৪১৩টি চুরি, ৪০টি ডাকাতি, ১৫টি অপহরণ এবং ৩৮টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে ৪৯৭টি অপমৃত্যুর ঘটনাও রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময় ৬১টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসব পরিসংখ্যান অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির আইন বিভাগের প্রধান ড. নায়ীম আলীমুল হায়দার বলেন, কুমিল্লার মতো জনবহুল ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের উচ্চহার উদ্বেগজনক। কিশোর গ্যাং, অস্ত্রের সহজলভ্যতা, মাদক ও সীমান্ত চোরাচালান, আইন প্রয়োগে দীর্ঘসূত্রতা এবং সামাজিক ও পারিবারিক নজরদারির অভাব অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, আইনের কঠোর ও দৃশ্যমান প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।

বিভিন্ন ঘটনার প্রাথমিক তথ্যে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিনতাই, পারিবারিক ও জমিসংক্রান্ত বিরোধ, পূর্বশত্রুতা এবং আধিপত্য বিস্তারের মতো বিষয় উঠে এসেছে। পাশাপাশি মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, চাঁদাবাজি ও চুরির অভিযোগও রয়েছে। নগর এলাকা থেকে মহাসড়ক পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে অপরাধের আশঙ্কায় বিশেষ করে রাতে চলাচল নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, যাত্রী কিংবা চালকের ছদ্মবেশে ছিনতাইকারীরা বিভিন্ন যানবাহনে অপরাধ সংঘটিত করছে।

 

আলোচনায় তিন হত্যাকাণ্ড

 

চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়িতে আইরিশ হিল হোটেলের পাশের ফুটপাত থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল।

র‍্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে বাস থেকে নামার পর তিনি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়েন। যাত্রী ও চালকের ছদ্মবেশে থাকা চক্রের সদস্যরা তাঁকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দেওয়ায় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাঁকে চলন্ত অটোরিকশা থেকে সড়কে ফেলে দেওয়া হয়। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানানো হয়েছিল।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ওই ঘটনায় মোবাইল ফোন ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনার বিভিন্ন দিক তদন্ত করে।

সবশেষ গত ৮ অক্টোবর কুমিল্লার লালমাইয়ে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারায় কুমিল্লা ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায়ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককেন্দ্রিক সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ছিনতাইকারী চক্রের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে।

পরপর এসব ঘটনায় মহাসড়ক ও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাসস্ট্যান্ড, অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থান এবং আবাসিক এলাকার আশপাশে নিয়মিত পুলিশি টহল প্রয়োজন। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা কিংবা অন্যান্য যানবাহনে চলাচলকারীরা ছিনতাইকারীদের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় রাতে চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা জরুরি কাজে বের হতেও অনেকে দ্বিধা করছেন।

 

জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশ কম

 

কুমিল্লা জেলায় প্রায় ৬৫ লাখ মানুষের বিপরীতে পুলিশ সদস্য রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন। সে হিসাবে প্রতি ২ হাজার ৬০০ মানুষের বিপরীতে গড়ে একজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। তবে এ হিসাব সামগ্রিক জনসংখ্যার অনুপাতে করা; একজন পুলিশ সদস্যের এককভাবে এত মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি বোঝায় না। পুলিশের দায়িত্ব, কর্মবণ্টন ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজও বিবেচনায় নিতে হয়।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান বলেন, জেলায় ১৮টি থানা রয়েছে। কুমিল্লা মহানগর এলাকায় একটি মেট্রোপলিটন থানা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ৫০০ সদস্য নিয়ে এই থানা গঠন করা গেলে নগরীর অপরাধপ্রবণতা অনেক কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আলী আহসান টিটু বলেন, অপরাধ প্রতিরোধে দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, অপরাধ সংঘটিত হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান ও আন্তরিক ভূমিকা নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, কুমিল্লা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ায় এখানে অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে সামাজিক মূল্যবোধেরও সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন। সমাজকে এ অবস্থা থেকে বের করে আনতে সময় লাগবে।

 

অপরাধ দমনে তৎপর পুলিশ, দাবি কর্মকর্তার

 

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) লুৎফুর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সতর্ক ও সক্রিয় রয়েছে। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের আটক করা হচ্ছে।

তিনি জানান, ১৫ দিনের অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য সন্দেহে ২ হাজার ২৯২ জনকে আটক করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে অপরাধে জড়িত নন—এমন ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং অন্যদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে—এমন অভিযোগ সঠিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কুমিল্লা বড় ও সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এখানে অপরাধের ঝুঁকি বেশি। কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত অভিযুক্তদের আটক এবং ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে।

প্রিন্ট করুন