কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষণকদের দু’পক্ষের হট্টগোলে নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার ১টার দিকে এ ঘোষণা দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. জি এম মনিরুজ্জামান। আবারও নির্বাচনকে কেন্দ্র আবারও সামনে এসেছে আওয়ামীলীগ পন্থি শিক্ষকদের বিভক্তি-দলাদলি। এদিকে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেছে একটি পক্ষ। তবে অন্যপক্ষ নির্বাচন বানচালকারীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
খোজঁ নিয়ে জানা যায়, কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী এদিন সকাল ৯টায় পরিসংখ্যান বিভাগের একটি ক্লাস রুমে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি কমিশন।
এসময় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাইদুল-রায়হান সমর্থিত একটি পক্ষের শিক্ষকেরা ভোট দিতে লাইনে দাড়াঁলেও সিদ্দিকী-জাহিদ সমর্থিত বঙ্গবন্ধু পরিষদের আরেকটি পক্ষ এতে বাধা দেয়। তাদের দাবি নির্বাচন শিক্ষক লাউঞ্জে না হয়ে ক্লাসরুমে হতে পারেনা এবং গঠনতন্ত্র মোতাবেক নির্বাচন হচ্ছেনা। এসময় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হলে কার্যক্রম স্থগিত রাখে কমিশন। এদিকে বিএনপি-জামাত সমর্থিত শিক্ষকদের প্যানেল ঘোষণা করলেও নির্বাচনী এলাকায় তাদের দেখা যায়নি।

এর আগে গত ২২ নভেম্বর শিক্ষক সমিতির একাদশ কার্যনির্বাহী পরিষদ-২০২৩ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। একইদিনে ড. মনিরুজ্জামানকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে তিন সদস্যবিশিষ্ঠ কমিশনও গঠন করা হয়। তবে শুরু থেকে তড়িঘড়ি নির্বাচন দেওয়ার অভিযোগ করে নির্বাচনে অংশ নেয়নি ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’র প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) কাজী ওমর সিদ্দিকী ও ব্যবস্থপনা শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক জাহিদ হাসান সমর্থিত একটি অংশ। শিক্ষকদের এপক্ষ ভিসিপন্থি হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত। ব্যবস্থপনা শিক্ষা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইদুল আল আমিন ও প্রত্নতত্ত¡ বিভাগের শিক্ষক মুর্শেদ রায়হান সমর্থিত ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’র আরেকটি পক্ষ ‘নীল দল’র ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নেয়। এতে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক ড. আবু তাহেরকে সভাপতি এবং অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী করে পূর্ণ প্যানেল ঘোষণা করে। এপক্ষটি বর্তমান শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বে আছে। নির্বাচন তারিখ ঘোষণা নিয়ে শুরু থেকে অভিযোগ থাকলে ৭টি পদে প্যানেল ঘোষণা করে সাদা দল। এতে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএম শরীফুল করিমকে সভাপতি ও মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলাইমানকে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী করা হয়।

এদিকে নির্বাচনে শিক্ষকদের একটি পক্ষ দখল করেছে দাবি করে সাইদুল-মুর্শেদ সমর্থিত পক্ষের নেতা অধ্যাপক ড. শামিমুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক সমিতি গঠনতন্ত্র মেনেই আজকে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। সঠিক সময়ে আমরা ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হই। ভোট শুরুর পাচঁ মিনিট আগে প্রক্টরের নেতৃত্বে কিছু শিক্ষক ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করে এবং অবস্থান নেয়। তারা নানাভাবেই ভোট নেওয়ায় বাধা সৃষ্টি করেছে। তারা ১টা পর্যন্ত বসে থাকে, আমরা শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে শান্তিপূর্ণ অপেক্ষা করেছি। তারা ভোটকেন্দ্র দখল করে কমিশনকে স্থগিত করতে বাধ্য করে।

আরেক পক্ষের নেতা আইনুল হক বলেন, আমরা নির্বাচন বানচাল করিনি, স্থগিত চেয়েছি। তফসিলে উল্লেখ ছিল ভোটকেন্দ্র শিক্ষক লাউঞ্জ, সেটা পরিসংখ্যান বিভাগের ক্লাসরুমে নিয়ে গেছে তারা। যেটি রাত ১২টায় কিছু শিক্ষককে মেইলে জানানো হয়। যেখানে জাতীয় নির্বাচনেও ৭২ ঘন্টা আগে জানাতে হয়। তারা গোপনীয়ভাবে একটা শিক্ষক সমিতির গঠন করতে চেয়েছে। আমরা নির্বাচন নিয়ে আমরা ১০৬ জন শিক্ষক অনাস্থা দিয়েছি, তারা আলোচনা পর্যন্ত করেনি। আমার দাবি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করে একটি শিক্ষক সমিতির গঠন করতে হবে।

সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ড. সোলাইমান বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি। শিক্ষক লাউঞ্জে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও গিয়ে দেখি ক্লাসরুমে হচ্ছে। এটি নিয়ে আমাদেরও আপত্তি ছিল। ব্যাক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এখানে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। সারাদেশে নির্বাচন সংস্কৃতি নাই, এখন বিশ^বিদ্যালয়ে যদি এমন হয় তাহলে জাতির কাছে কি বার্তা যায়?
শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. দুলাল চন্দ্র নন্দী বলেন, আমরা গঠনতন্ত্র মেনে নির্বাচন দিয়েছি। তারা ভোটকেন্দ্র দখল করে গায়ের জোরে নির্বাচন বানচাল করে এবং স্থগিত করায়। তারা চেয়েছিল আরো কিছু শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে নির্বাচনে আসতে।

কমিশনার ড. মনিরুজ্জামান বলেন, ভোট নিতে গেলে শিক্ষকদের একটি গ্রুপ কেন্দ্র দখলে রাখে। ভোট গ্রহণে পরিবেশ পায়নি আমরা। আমরা বারবার অনুরোধ করেছি কিন্তু কেউ ভ্রুক্ষেপ করেনি। কবে নাগাদ নির্বাচন হবে জানতে চাইলে বলেন, ফলাফল পর্যন্ত এ কমিশনের কাজ ছিল, কবে হবে সেটি শিক্ষক সমিতি বলতে পারবে।
সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম আবদুল মঈন বলেন, আজকের নির্বাচন হবে সেটি আমাকে অগে জানানো হয়নি। কয়েকদিন আগে অন্য মাধ্যমে জানতে পেরে আমি কমিশনারকে ডেকেছি, সবপক্ষ নিয়ে নির্বাচন দিতে বলেছি। কিন্তু তা কার্যত সম্ভব হয়নি। সমিতিতে কে আসল না আসলো সেটা আমার দেখার বিষয় না। শিক্ষক সমিতি স্বতন্ত্র জায়গা, এটি তাদের বিষয়। তবে আমার একটাই কথা ছিল কোনভাবে যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেজ নষ্ট না হয়।

শিক্ষক লাউঞ্জে ব্যবহার করতে না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, দুইটি গ্রুপই শিক্ষক লাউঞ্জ ব্যবহার করতে চেয়ে আবেদন করেছি। দুইটি গ্রুপ চাইলে তো এখানে একটি শঙ্কা থাকে, তাই প্রশাসনিক ভবনের বাইরে যেকোন রুমে করতে বলেছি।

এবিএস ফরহাদ, কুবি :