প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

যুদ্ধদিনের স্মৃতি : মিয়াবাজারসহ তিন সেতু বিস্ফোরক দিয়ে ধ্বংস করে দেই

মীর শাহ আলম :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে সবেমাত্র লেখাপড়া শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করার চিন্তা ছিল মফিজুর রহমান বাবলুর। কিন্তু একাত্তরের ২৬ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর অতর্কিতে হামলে পড়লে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সোনামুড়া মহকুমার কাঠালিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম ক্যাম্পে সশস্ত্র ট্রেনিং নেওয়ার জন্য চলে যান তিনি। সেখানে তার সঙ্গে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন কুমিল্লার রাজপথ কাঁপানো নেতা আফজল খান, আকবর হোসেনসহ অন্যরা।
সেখানে তারা ১০ দিনের ট্রেনিং নেন। পরে ২নং সেক্টরের অধীনে থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এ ছাড়া বিলোনিয়া মহকুমার রাজনগর থানার রাধানগরে প্রশিক্ষণ শিবির খুলে পূর্ব পাকিস্তানের পাঁচ সহ¯্রাধিক যুবককে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সমন্বয়কের দায়িত্বে থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই বীর সন্তান কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার নোয়াপুর গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান ও লতিফা খাতুনের ছেলে।
যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মফিজুর রহমান বাবলু বলেন, পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে তার নোয়াপুর গ্রামের বাড়িটি ছিল এতদাঞ্চলের মুক্তিবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প। আওয়ামী লীগের নেতারাও বিভিন্ন সময়ে সেখানে বৈঠকে মিলিত হতেন। তৎসময়ে এমএনএ ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর কাজী জহিরুল কাইয়ুম বাচ্চু মিয়া ওই বাড়িটি নিরাপদ মনে করে সেখানে থাকতেন এবং তার সঙ্গে অন্য বড় মাপের মুক্তিযোদ্ধারাও ছিলেন। রাজাকারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পাক হানাদার বাহিনী এ খবর পেয়ে দিন-দুপুরে নোয়াপুর গ্রামের বাড়িটি ঘেরাও করে।
মফিজুর রহমান বাবলু বলেন, একাত্তরের জুলাই মাসে তার আপন চাচা শফিকুর রহমান, আমিনুর রহমান, আবদুল খালেক, মো. আলম এবং ফেনীর শর্শদী গ্রামের গোলাম আজম নামের এক মেহমানকে হানাদার বাহিনী ধরে ফেলে। তাদেরকে রশি দিয়ে পীঠমোড়া করে বেঁধে ফেলা হয় এবং দাদা শওকত আলী মজুমদারের সামনে বাড়ির সম্মুখে প্রথমে তার বড় ছেলে শফিকুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

প্রথম ছেলেকে হত্যার আগে হানাদাররা বলে, বুড্ডার খেল দেখুয়া। এভাবে পর্যায়ক্রমে একের পর এক চার চাচা ও এক মেহমানসহ পাঁচজনকে হানাদাররা এক ঘণ্টার মধ্যে গুলি করে মেরে ফেলে।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ওই দিনের স্মৃতি মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, পাকবাহিনী পাঁচজনকে হত্যার পর আমার দাদাকে জীবিত রেখে বাড়ি থেকে চলে গেলেও আমার দাদা শওকত আলী মজুমদারের চোখের সামনে তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে একাধারে তার চার সন্তান ও মেহমানকে হত্যার ঘটনায় তিনি (দাদা) বাকরুদ্ধ ও শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ছেলেদের এমন নির্মম হত্যাকা- দেখে শোকে তিনি তিন বছর পর মৃত্যুবরণ করেন।

 

একাত্তরে এতদাঞ্চলে কিংবা অন্য কোথাও বাবার চোখের সামনে টগবগে চার সন্তানকে এমন নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই। তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর এই বীর শহীদদের স্মরণে সরকারিভাবে নোয়াপুর গ্রামে ‘নোয়াপুর শহীদ স্মৃতি পাঠাগার’ স্থাপন করা হয়।
যুদ্ধদিনের স্মৃতি প্রসঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিজুর রহমান বাবলু আর বলেন, বর্তমান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা ও চৌদ্দগ্রাম অঞ্চলে পাকবাহিনী সাঁজোয়া যানবাহনে করে বিভিন্ন এলাকার বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করত। তাদের প্রতিরোধ করতে আমরা তখন সড়কের মিয়াবাজার, নোয়াবাজার, লালার পুলে বিস্ফোরক লাগিয়ে সুইচ টিপে পর্যায়ক্রমে এই তিনটি সেতু ধ্বংস করে দিয়েছিলাম। ফলে এতদাঞ্চলে তাদের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমে আসে। তিনি বলেন, আমাদের কাজ ছিল মূলত ‘হিট অ্যান্ড রান যুদ্ধ’।

একাত্তরের ৬ ডিসেম্বর চৌদ্দগ্রামের দু’দিক থেকে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ শুরু হলে পাকবাহিনীর একটি অংশ একপর্যায়ে পিছু হটে। তখন আমরা পরিকোট ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছিলাম। সে সব দৃশ্য আজো যেন চোখের সামনে ভাসছে, যা কখনো ভোলা যায় না।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিজুর রহমান বাবলু একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিক, প্রখ্যাত আইনজীবী ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী।

১৯৪৬ সালের ১০ আগস্ট জন্ম নেওয়া বাবলু তার মামা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি কাজী জহিরুল কাইয়ুমের হাত ধরে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে রাজনীতির পথে পা বাড়ান। তারপর ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ছিলেন অবিভক্ত কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। সে সময় জাতির পিতা ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা আন্দোলনে অংশ নেন।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে অংশ নেন ডাকসুর সদস্য হিসেবে। সত্তরের নির্বাচনে দলের হয়ে কাজ করেন। অংশ নেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন জেলা আওয়ামী লীগের সমাজ কল্যাণ সম্পাদকের। পরে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

 

১৯৮৬ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন চৌদ্দগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ১৯৮২ ও ১৯৮৮ সালে দলীয় কর্মসূচি পালনকালে বিএনপি ও ফ্রিডম পার্টির নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন রণাঙ্গনের এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি মফিজুর রহমান বাবলু নিজেকে জড়িয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ড। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এই বীর মুক্তিযোদ্ধার চাওয়া রাজনীতিকে অর্থ ও পেশীশক্তির কাছে জিম্মি না করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে শোষণহীন সুন্দর আগামীর একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে সকল শ্রেণি- পেশার মানুষকে এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

প্রিন্ট করুন