প্রিন্ট এর তারিখঃ সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩

দ্রুত পুলিশ ফাঁড়ি পুনরায় চালুর দাবি মাদক ও ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য কুমিল্লার হাউজিং এস্টেট

অনলাইন ডেস্ক :

কুমিল্লা নগরীর হাউজিং এস্টেট আবাসিক এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই বসে মাদক সেবনকারী ও মাদক বিক্রেতাদের আড্ডা। এর সঙ্গে যোগ দেয় ছিনতাইকারীরা। ফলে মাদক সেবনকারী, ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীদের অভ্যায়ণ্যে পরিনত হয়েছে নগরীর অন্যতম আবাসিক এলাকা হাউজিং এস্টেট।

স্থানীয় সূত্রের প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, হাউজিং স্টেটের ১, ২, ৩ ও ৪ নং সেকশনে বর্তমানে বসবাসের জন্য চরম ঝুঁকি। এখানে মাদক সেবনকারীদের উৎপাত বেশি। হাউজিং এস্টেটকে নিরাপদ রাখার জন্য ১৯৯১ সালে হাউজিং এস্টেট পুলিশ ফাঁড়ি নামের একটি ফাঁড়ি উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন পুলিশ সুপার মোঃ সিরাজুল ইসলাম। এই পুলিশ ফাঁড়ি উদ্বোধনের পর হাউজিং এস্টেট এলাকায় মাদক, ছিনতাই, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ২০০৯ সালে বিভিন্ন সমস্যার কারণে এই পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রম একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে হাউজিং এস্টেট, নূরপুর, ২য় মুরাদপুর, বারপাড়া এলাকার মানুষ অনিরাপদ হয়ে উঠে। সন্ধ্যা নামলেই চলে বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে নানা অসামাজিক কার্যকলাপ। ভোরের দিকে চলে চোর ও ছিনতাইকারীদের দাপট।

এলাকাবাসী আরো জানান, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই হাউজিং এলাকা বিভিন্ন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। ফলে হাউজিংয়ের প্রায় ১৭ টি ছোট বড় স্পটে বসে মাদকসেবীদের ভয়াবহ আড্ডা। সন্ধ্যার পর এদের কারণে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ায় সমস্যা হয় বলে কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করেন।

বিশেষ করে হাউজিং এস্টেট স্কুল এন্ড কলেজের সামনে বখাটেদের আড্ডা জমেই থাকে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশ ফাঁড়ির প্রতিটি দরজা-জানালা ভাঙ্গা। ভেতরে মাদকের বিভিন্ন সরঞ্জাম পড়ে আছে। রাতে ভেতরে মোমবাতি জালিয়ে চলে মাদক সেবন। এই এলাকার জামদিঘীর উত্তর-পূর্ব, দক্ষিণ পাড়, হাইকোর্ট কলনীসহ কয়েকটি রাস্তার বিভিন্ন স্পটে মাদকসেবীরা ছোট ছোট দলে বসে মাদক সেবন করছে। এই রাস্তা গুলি মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের পছন্দের স্থান বলে জানান সচেতন মহল।

স্থানীয় বাসিন্দা ডা.খায়ের জানান, আমি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। অফিসের কাজে আমার অনেক রাত হয় বাসায় ফিরতে। কখনো এই রাস্তায় হাটতে ভয় পাইনি, কিন্তু এখন পাই। স্থানীয়রা কোনো প্রকার বাধা দিলে তাদের বাসার সামনে এসে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ সহ ভয় দেখানো হয়। ওই এলাকার ইমন নামে এক দোকানদার বলেন, কিছু বহিরাগত ছেলে-মেয়ে ইদানিং গোলমার্কেটের আশেপাশে আড্ডা দেয়। তাদের কর্মকান্ড দেখে লজ্জায় মাথা নিচু করে চলতে হয়। এদের কারণে আমার স্ত্রী স্কুলে ছেলেকে নিতে চায়না। কষ্ট করে আমাকে নিয়ে যেতে হয়।

তিনি আরো বলেন, এখানে যারাই এমন অপরাধমূলক কাজ করছে তারা সবাই এলাকার ও এলাকার বাইরের মাদকসেবনকারী। রাতে যারাই আড্ডা দেয় এবং নেশা করে তাদের দেখা যায় এ রাস্তায়। এ রাস্তাগুলোতে লাইট থাকলেও তারা ভেঙে ফেলে, এতে কিছুটা অন্ধকার হওয়াতে তারা এমন সুযোগ পায়। প্রশাসনের উচিত যতদ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়া।

সালাউদ্দিন নামে স্থানীয় আরেক বাসিন্দা জানান, এইতো কিছুদিন আগে হাউজিং ২ নং সেকশনে সামান্য টাকা ছিনতাই করতে জীবন্ত একটি মানুষকে খুন করেছে কিছু বখাটে। এর আগে ৩নং সেকশনে এজাজ নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা খুন হয়েছে।এরকম প্রায় খুন, ছিনতাই, মাদকের রাজধানী হয়ে উঠছে হাউজিং। প্রশাসনের নিকট দাবি দ্রুত পুলিশ ফাঁড়িটি চালু করে দিন।

হাউজিং উন্নয়ন কমিটির সাবেক সেক্রেটারি এম.আর খান বলেন, এই হাউজিং এস্টেট উন্নয়নের জন্য ১০১৬ সালে সিটি কর্পোরেশনের সহযোগিতায় ও হাউজিং উন্নয়ন কমিটির সমন্বয়ে আমি একটি আবেদন করেছিলাম। তখন সিটি কর্পোরেশন ও হাউজিং এস্টেট উন্নয়ন কমিটির সমন্বয়ে ২০ কোটি টাকার একটি বরাদ্দ পায় হাউজিং এস্টেট। এর পর থেকে ছোট বড় প্রায় ৩২ টি রাস্তা, ড্রেন ও লাইটিং ব্যবস্থা করা হয়। এই উন্নয়ন হলেও আমাদের পুলিশ ফাঁড়িটি অকেজো হয়ে আছে। এতে আমাদের হাউজিং এখন চুরি, ছিনতাই, মাদক ও ইভটিজিং বেড়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, এই পুলিশ ফাঁড়িটি যদি পূণরায় চালু হতো তাহলে হাউজিং এস্টেটের মানুষ অনেকটাই এসব অপকর্ম থেকে পরিত্রাণ পেতো।

কুমিল্লা হাউজিং এস্টেট স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ জহিরুল আলম বলেন, আগে আমার স্কুলের মেয়েদের উত্তাক্ত করতো কিছু বখাটে। এখন বাউন্ডারি ওয়াল হওয়াই অনেকটা কমেছে। তবে আমার ও হাউজিং বাসীর প্রানের দাবি এখানের পুলিশ ফাঁড়িটি আগের মতো চালু হোক।

১৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এড.শওকত আকবর বলেন, একটি পুলিশ ফাঁড়ির জন্য অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছিলো। পরে ২০১৭ সালের দিকে এই পুলিশ ফাঁড়িটি বাউন্ডারি করা হয়েছিলো। পরে এটার প্রতি কেউ তেমন নজড় দেয়নি। আমরা সবাই প্রশাসনকে সকল সহযোগিতা করতে রাজি। তবুও এই পুলিশ ফাঁড়ি চালু চাই। এটা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ছে।

কুমিল্লা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) কামরান হোসেন বলেন, ওই এলাকায় মাদকের আনা গুনা থাকার কারনেই আমাদের পুলিশ সুপার স্যার আসার পরেই এই ফাঁড়ির ব্যাপারে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহন করেছে। অতিশীঘ্রই পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রম চালু হবে।

তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে সিটি কর্পোরেশন বলেছে এই ফাঁড়িটি চালুর জন্য সকল সহযোগিতা করবে। আশাকরি এই ফাঁড়ি চালু থাকলে মাদক, হত্যা, ছিনতাইসহ সকল ধরনের অন্যায় কাজ বন্ধ হবে। মাদক সেবনকারী ও মাদক বিক্রেতাদের আড্ডার ব্যাপারে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদকের বিরুদ্বে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।

কুমিল্লা পুলিশ সুপার আবদুল মান্নান বিপিএম বলেন, আমি আসার পর এটা চালু রাখার জন্য অলরেডি প্রস্তাব করেছি। কিছু কাজ করতে হলে সময়ের প্রয়োজন। এখন মাটি ভরাট ও পরিষ্কার করার কাজটি হলে বাকি কাজ গুলোও হয়ে যাবে।

প্রিন্ট করুন