নাস্তার টেবিল থেকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে কুমিল্লার একই পরিবারের তিনজন
Oplus_131072
ভোরের আলোয় শুরু হয়েছিল একেবারে স্বাভাবিক সকাল। দুই বছরের কাজী ফাইয়াজ রিশান খেলনা হাতে ঘরের ভেতর হাঁটছিল, মা আফরোজা আক্তার সুবর্ণা হয়তো রান্নাঘরে নাশতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, আর বাবা কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী ছিলেন ঘরের কাজে ব্যস্ত। কিন্তু সেই স্বাভাবিক সকালই মুহূর্তে রূপ নেয় বিভীষিকায়।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সকাল পৌনে ৮টার দিকে রাজধানীর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের একটি ছয়তলা আবাসিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় আগুন লাগে। মুহূর্তেই পুরো ভবন ছেয়ে যায় ঘন কালো ধোঁয়ায়। আগুনের চেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে সেই ধোঁয়া। প্রাণ হারান একই পরিবারের তিনজন—কুমিল্লার নানুয়া দিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) এবং তাদের দুই বছরের শিশু পুত্র কাজী ফাইয়াজ রিশান।
নিহত রিজভী ছিলেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের কর্মকর্তা এবং তার স্ত্রী সুবর্ণা স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করতেন। দুর্ঘটনার সময় তাদের বড় ছেলে ফাইয়াজ নানীর বাসায় থাকায় প্রাণে বেঁচে যায়।
এই অগ্নিকাণ্ডে আরও প্রাণ হারান ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের মো. হারিছ উদ্দিন (৫২), তার ছেলে মো. রাহাব (১৭) এবং ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৪)। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন লাগার পর ছাদে উঠতে চাইলেও ছাদের দরজা তালাবদ্ধ থাকায় কেউ বের হতে পারেননি। ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়েই মৃত্যু হয় তাদের।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে দুটি অ্যাম্বুলেন্সে করে কুমিল্লার নানুয়া দিঘির পাড় এলাকায় পৌঁছায় রিজভী, সুবর্ণা ও রিশানের নিথর দেহ। মুহূর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। সন্তান, পুত্রবধূ ও নাতির মরদেহের পাশে নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবা কাজী খোরশেদ আলম।
রাত ১০টায় দারোগাবাড়ি মাজার মসজিদ মাঠে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শনিবার সকালে চৌদ্দগ্রামের চিওড়া গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তিনজনকে।
নিহত রিজভীর চাচাতো ভাই কাজী ইরফান বলেন, “রিজভী ভাই ছিলেন ভদ্র, মেধাবী ও বিনয়ী মানুষ। আর ছোট্ট রিশান ছিল পরিবারের প্রাণ। এক নিমিষেই সব শেষ হয়ে গেল।”
চাচা কাজী ফখরুল আলম জানান, “তারা ছয়তলায় থাকলেও আগুন লেগেছিল দ্বিতীয় তলায়। ধোঁয়ার কারণে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান তারা। ছাদে উঠতে চেয়েছিল, কিন্তু ছাদের দরজা তালাবদ্ধ ছিল।”
বাবা কাজী খোরশেদ আলম বলেন, “সকালেই ফোনে আগুনের খবর পাই। ছেলের নম্বরে কল করেও পাইনি। ঢাকায় গিয়ে জানতে পারি, কেউ আর বেঁচে নেই। তাদের শরীরে আগুনের পোড়ার চিহ্ন ছিল না, ধোঁয়াতেই প্রাণ গেছে।”
এই মর্মান্তিক ঘটনায় কুমিল্লা জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক জানাচ্ছেন সহপাঠী, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা।



















