ঐতিহাসিক জলাশয় ধ্বংসের পথে
ডিসি পার্ক নিয়ে বিতর্ক!

কুমিল্লার রেইসকোর্স ও ছোটরা এলাকার প্রায় ১১ একর আয়তনের একটি ঐতিহাসিক জলাশয় ভরাট করে “ডিসি পার্ক” নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস করে পার্ক নির্মাণ জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ব্রিটিশ আমল থেকে কারাগারের দখলীয় সম্পত্তি হিসেবে পরিচিত এই জলাশয় বহু বছর ধরে সবজি চাষ, মাছ চাষ, কারাগারের সরকারি মহিষের খাদ্য এবং অতিথি পাখির বিচরণের ক্ষেত্র ছিল। একই সঙ্গে এটি রেইসকোর্স ও ছোটরা এলাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের মূল কেন্দ্র। স্থানীয়দের মতে, বৃষ্টির পানি ও ব্যবহার্য পানি জমে এই জলাশয়ের মাধ্যমে গোমতী নদীতে প্রবাহিত হয়। জলাশয়টি ভরাট হয়ে গেলে সামান্য বর্ষণেই বাদশা মিয়ার বাজার থেকে শুরু করে আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে।
এলাকার প্রবীণরা জানিয়েছেন, একসময় অতিথি পাখির আনাগোনায় জলাশয় প্রাণবন্ত থাকত। কিন্তু সংস্কারের অভাবে সেই সৌন্দর্য ও প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়েছে। তাদের বিশ্বাস, জলাশয়টি সংরক্ষণ ও পুনঃসংস্কার করা হলে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরবে এবং অতিথি পাখিরাও আবার ফিরে আসবে।
অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসক শুধুমাত্র নিজের নামের প্রচার ও ব্যক্তিগত স্বার্থে “ডিসি পার্ক” নির্মাণে তৎপর হয়েছেন। এলাকাবাসীর দাবি, জনগণ এ ধরনের পার্ক চান না। এর আগে জেলা পরিষদের পুরোনো চিড়িয়াখানাটিও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছিল, যেখানে এখন মাদক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সূত্র মতে, ৫ জুলাই ২০২৫ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি কুমিল্লায় সফরকালে সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরদিন কোনো নোটিশ ছাড়াই তিনি কারা কর্মকর্তাদের ডেকে জলাশয় জেলা প্রশাসনের পক্ষে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। এমনকি তাঁর স্বাক্ষরে একটি রেজুলেশন জারি হয়, যেখানে অন্য কোনো সদস্যের স্বাক্ষর ছিল না। স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কেবিনেট সচিবের দপ্তর থেকে আসার কথা, সার্কিট হাউসের বৈঠক থেকে নয়। ফলে এ সিদ্ধান্তকে তারা আইনবহির্ভূত ও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, কারাগারের চলমান প্রকল্প থেকে প্রস্তাবিত স্কুল ও কলেজ বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সচিব। পরিবর্তে কারাগারের পেরিমিটার ওয়ালের সংলগ্ন এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের প্রস্তাব দেন, যা স্থানীয়দের মতে কারাগারের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।
এলাকাবাসীর দাবি, জলাশয় ভরাট করে পার্ক নয়, বরং এটিকে প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবেই সংরক্ষণ করা হোক। এতে একদিকে জলাবদ্ধতা রোধ হবে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে। তারা প্রশ্ন তুলছেন, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত প্রচার আর স্বার্থের জন্য সাধারণ মানুষের জীবন ও পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কতটা ন্যায্য?
এ বিষয়ে কুমিল্লার জেলা প্রশাসকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি অনেক পুরোনো সমস্যা ছিল। চার মাস আগে ভূমি মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একসাথে বসে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে সমাধান করা হয়। তিনি আরো বলেন এখানে একইসঙ্গে কারাগারের প্রকল্প ও ডিসি পার্কের কাজ চলছে।

















