পলাতক বাহারের অফিসে চৌধুরীর প্রচারণা-ত্যাগীরা নেই, বিতর্কিতরাই মুখ্য
কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মনিরুল হক চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণা ঘিরে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন। একের পর এক বিতর্কিত ও বিচারাধীন মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রচারণায় যুক্ত হওয়া কুমিল্লার রাজনীতিকে ঠেলে দিচ্ছে এক অস্বস্তিকর ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থানে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিজয় মিছিল শেষে মোগলটুলীতে গুলিবিদ্ধ হন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী পরিষদের সদস্য এডভোকেট আবুল কালাম আজাদ। ১৬ আগস্ট ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বাহার কন্যা সূচি, ৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর রায়হান ও বিপুসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় পুলিশ। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চার্জশিটভুক্ত আসামি মো. বিপু বর্তমানে মনিরুল হক চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণায় পলাতক থাকলেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্নভাবে প্রাপ্ত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ফ্যাসিষ্ট সাবেক মেয়র সূচীর ব্যবসায়ীক পার্টনার বিপু সহ অনেকে বিএনপির প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. তিতাস, আরাফাত ওরফে লাচ্ছি আরাফাত , নিপু,রিফাত, রুমি,হানিফ,মো. জসিম( মাদকসেবী কালা জসিম) ও মো. নসু মিয়া। এদের কেউ কেউ এক সময় পলাতক সাবেক সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ও হত্যা মামলার আসামি এবং তার নির্বাচনী কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন।
বর্তমানে তারা মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার জন্য আয়োজিত দোয়া মাহফিলে অংশ নিচ্ছেন এবং বিএনপির ব্যানারে মনিরুল হক চৌধুরীর প্রচারণায় যুক্ত হয়েছেন। এই রূপান্তর ও অবস্থান পরিবর্তনের চিত্র সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে রাজনীতি কি এখন আদর্শ নয়, বরং সুবিধার নামে ছদ্মবেশের খেলা?
নগরীর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মোগলটুলীর যে অফিস থেকে এক সময় পলাতক এমপি বাহার, মরহুম রিফাত ও বাহার কন্যা সূচির নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালিত হতো, আজ সেই একই অফিস এবং কর্মীবাহিনী দ্বারা চলছে মনিরুল হক চৌধুরীর প্রচারণা। আর সেই প্রচারণার হাল ধরেছে আওয়ামী লীগের সময়কার সুবিধাভোগী ও বর্তমানে ছোলং পাল্টে বিএনপির ছায়ায় ঢুকে পড়া একদল রাজনৈতিক ব্যবসায়ী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, প্রকাশ্যে বিএনপির ব্যানার ব্যবহার করে পলাতক এমপি বাহার ও তার ঘনিষ্ঠদের পুনরায় সংগঠিত করতেই এই রাজনৈতিক অবস্থান বদলের কৌশল নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মিথ্যা মামলা ও হামলার হুমকি দেওয়া হয়। স্থানীয়ভাবে এমনও অভিযোগ উঠেছে যে, বিগত সময়ে যারা বিএনপির রাজনীতি করে হামলা-মামলায় জর্জরিত ছিলেন, আজ তারা এই নতুন চক্রের প্রভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মীরা রাজনীতির মাঠে জায়গা হারাচ্ছেন। এ বিষয়ে জেলা ও মহানগরের কোন কোন নেতার পৃষ্ঠপোষকতারও অভিযোগ উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ। শহীদ এডভোকেট আজাদের সহকর্মীরা বলছেন, এটি শুধু একজন শহীদের প্রতি অবমাননা নয়, বরং পুরো বিচারব্যবস্থার প্রতিও চরম অবজ্ঞা। তারা মনে করেন, বিচারাধীন মামলার আসামিদের রাজনৈতিক প্রচারণায় যুক্ত করা ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই প্রেক্ষাপটে কুমিল্লার মানুষ এখন স্পষ্টভাবে জানতে চায়—মনিরুল হক চৌধুরী কি বিচারাধীন মামলার আসামিদের কাঁধে ভর করেই সংসদে যেতে চান, এই শহরের ভবিষ্যৎ কি তবে বিতর্কিত অতীতের ছায়ায় পরিচালিত হবে?।
এই প্রেক্ষাপটে বারবার ফিরে আসে আপোষহীন নেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতীক মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ ও বাণী।
তিনি বলেছিলেন, আমার রাজনীতি ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।
আমি মাথা নত করিনি, করব না। অন্যায়ের কাছে আপোষ নয়, প্রতিরোধই আমার পথ।
বিএনপি কোনো ব্যক্তির দল নয়, এটি একটি আদর্শের নাম-এটি গণতন্ত্রের প্রতীক।
এই বাণীগুলো আজ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, যখন বিএনপির ব্যানারে বিতর্কিত অতীতের ব্যক্তিদের দেখা যাচ্ছে। বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের মূলমন্ত্র ছিল-সত্য, ন্যায় ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা। তার আদর্শে ছিল না বিচারাধীন ব্যক্তিদের দিয়ে রাজনীতি পরিচালনা।
বিএনপির প্রতিটি কর্মী ও সমর্থকের উচিত, বেগম খালেদা জিয়ার আপোষহীন আদর্শকে সামনে রেখে রাজনীতিকে কলুষমুক্ত রাখা। শহীদদের আত্মত্যাগ যেন রাজনৈতিক সুবিধার পেছনে বিলীন না হয়-এটাই হোক কুমিল্লার জনগণের অঙ্গীকার।



















