মাঠ প্রশাসন ঢেলে সাজাচ্ছে ইসি
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করতে নতুন করে মাঠ প্রশাসন ঢেলে সাজাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে প্রশাসন ও পুলিশে বড় ধরনের রদবদলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু করেছে সংস্থাটি। ইসির পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং থানার ওসিদের বদলি করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও জননিরাপত্তা বিভাগে পৃথক চিঠি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সব জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) পদেও বদলি করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে এক বছর ধরে কর্মরত আছেন এমন সাড়ে তিনশর বেশি ইউএনও এবং ছয় মাসের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন এমন চারশ ওসিকে আগামী সপ্তাহের মধ্যে বদলি করা হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট করতে ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী এ ধরনের বদলি প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে করা হয়। প্রথম পর্যায়ে উপজেলায় এক বছরের বেশি সময় ধরে থাকা ইউএনওদের এবং একই থানায় ছয় মাসের বেশি সময় ধরে থাকা ওসিদের বদলির প্রস্তাব ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে বলা হয়েছে। ইসি ওই প্রস্তাব অনুমোদন করলে বদলির আদেশ জারি করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও জননিরাপত্তা বিভাগ। পর্যায়ক্রমে অন্য ইউএনও ও ওসিদেরও বদলি করা হবে।
এ ছাড়া প্রার্থীর প্রতি পক্ষপাতসহ বিভিন্ন অভিযোগ থাকায় কজন ডিসি-এসপিকে প্রত্যাহার ও বদলির কথাও বলেছে ইসি। ইসির এই নির্দেশনার পর শনিবার দুই জেলায় ডিসি পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহের ডিসি মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে প্রত্যাহার করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে উপসচিব হিসেবে বদলি করা হয়েছে। আর সুনামগঞ্জের ডিসি দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরীকে ময়মনসিংহের নতুন ডিসি করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে সংযুক্ত উপসচিব মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরীকে করা হয়েছে সুনামগঞ্জের ডিসি। গতকাল এ বিষয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ জানান, ময়মনসিংহের ডিসিকে ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যাহার করেছে মন্ত্রণালয়। অন্যদের বদলি করা হয়েছে।
সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ আর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী নির্বাচনি কাজে কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব পাওয়ার পর তাকে অব্যাহতি না দেওয়া পর্যন্ত চাকরির অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তিনি ইসির অধীনে প্রেষণে আছেন বলে গণ্য হবে। নির্বাচনের সময়সূচি জারি থেকে ফল ঘোষণার পর ১৫ দিন পর্যন্ত ইসির অনুমতি ছাড়া কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অন্যত্র বদলি করা যাবে না।
আরপিও অনুযায়ী নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে সরকারের কোনো বিভাগ বা কোনো সংস্থার যেকোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিতে পারে ইসি। নির্দেশনা পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব তা বস্তবায়ন করা ওই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অবশ্য এর আগে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসিকে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে ইসি সচিব, জনপ্রশাসন ও পুলিশের ৯২ জন কর্মকর্তার প্রত্যাহার চেয়ে তখনকার বিরোধী রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ইসিকে চিঠি দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, সংবিধান ও আইনে দেওয়া ক্ষমতাবলে ইসি চাইলে মাঠ প্রশাসন ও পুলিশে রদবদল করার উদ্যোগ নিতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ এর আগেও জাতীয় নির্বাচনের সময় ইসির পক্ষ থেকে নিতে দেখা গেছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে পুলিশ প্রশাসন নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে। পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হয়ে। তবে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তাকে বদলি করা কিংবা না করা হলে সে ক্ষেত্রে কমিশন কী করতে পারে তা নিয়ে আইনে কিছু বলা নেই। সংবিধানে বলা আছে, নির্বাহী বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করবে। কিন্তু যদি না করে তা হলে কী করা হবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলা না থাকায় ইসিকে বিভিন্ন সময়ে বিপাকে পড়তে হয়।
আগামী ৭ জানুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হবে ১৮ ডিসেম্বর। জাতীয় নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকে পুলিশ ও প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ডিসি, ইউএনও, এসপি ও থানার ওসিরা। এর মধ্যে ডিসিরা রিটার্নিং কর্মকর্তা, ইউএনওরা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাঠ পর্যায়ে তারাই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় থাকছেন। এ কারণে সবসময় দেখা যায়, জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকারের পক্ষ থেকে মাঠ প্রশাসন ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবারও নির্বাচন সামনে রেখে গত জুন ও জুলাইয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল করেছে সরকার। গত জুলাইয়ে ৩০টি জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক এবং ৫ বিভাগে নতুন বিভাগীয় কমিশনার পদে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি অন্তত ৭০টি উপজেলায় ইউএনও বদল করা হয়। এ ছাড়া কাছাকাছি সময়ে পুলিশের ডিআইজি ও পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ৬৯ কর্মকর্তাকে রদবদল করা হয়। তখন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করেছিল, সরকার নির্বাচন সামনে রেখে পছন্দমতো মাঠ প্রশাসন সাজাচ্ছে। এ অবস্থায় প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে নির্বাচন কমিশন পর্যায়ক্রমে সব ইউএনও ও ওসিদের বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সারা দেশে ৬৪টি জেলায় ৪৯৫টি উপজেলা এবং সাড়ে ছয়শ থানা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ গণমাধ্যমকে বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতেই এই বদলি করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনারদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এই বদলির কারণে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে না। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসকদেরও বদলি করা হবে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে পুলিশ বা মাঠ প্রশাসনে রদবদল প্রয়োজন, তা হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে তারা নির্দেশনা দিতে পারে। এর আগেও এমন হয়েছে। কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী সরকার যদি কাজ না করে তা হলে আইনের বরখেলাপ হবে।





















