সৌদি আরবে সড়ক দূর্ঘটনায় বাংলাদেশ প্রবাসী গিয়াস উদ্দিন মীরের মৃত্যু
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র নিকট নিহত গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রী রাবেয়া বেগমের আকুল আবেদন স্বামীর লাশটি যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করে দেন।
ওমরাহ হজ্জ পালন করতে গিয়ে সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় গিয়াস উদ্দিন মীর (৪৯) নামে এক প্রবাসী বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছে। এ খবরে বুধবার (২৯ মার্চ) নিহত ওই প্রবাসীর কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার রাজামেহার গ্রামের মীর বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। তার এই মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কান্নার রোল চলছে স্ত্রী মোসাঃ রাবেয়া আক্তারসহ স্বজনদের মাঝে।

ছয় বছরের শিশু আমেনা জন্মের পর দেখেনি তার প্রবাসী বাবার মুখ। মায়ের আর্তচিৎকারে ও শিশু আমেনার বুঝতে পারেনা যে তার বাবার মুখ চিরতরে আর কখনো দেখবেনা।
নিহত গিয়াস উদ্দিন ২০০১ সাল থেকে তিনি সৌদি আরবে প্রবাস জীবন শুরু করেন। ০৭ বছর আগে ও একবার দেশে এসেছিলেন গিয়াস উদ্দিন। তার ১ ছেলে, ২ মেয়ে। বড় ছেলে মো. আবদুর রহমান (১৬), মেঝো মেয়ে মোসাঃ সাদিয়া আক্তার (১২) ও ছোট মেয়ে মোসাঃ আমেনা আক্তার (০৬) । নিহত গিয়াস উদ্দিনের বড় ভাই জসিম উদ্দিন ও দীর্ঘদিন ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় বছর খানেক আগে।
গিয়াস উদ্দিন মীরের স্ত্রী মোসাঃ রাবেয়া আক্তার (৩৬) এর সাথে মোবাইল ফোনে ২৭ মার্চ সকালে সর্বশেষ কথা বলেছিলেন গিয়াস উদ্দিন মীর। তিনি বলেছিলেন আমি ওমরাহ হজ্ব পালন করে আগামী ২ এপ্রিল দেশে আসবো আমার জন্য দোয়া কইরো আমার ছেলে মেয়েদের দেখে রাইখো। ২৮ মার্চ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সৌদি থেকে খবর আসে তার স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে।
নিহতের বড় ছেলে দশম শ্রেণির ছাত্র আব্দুর রহমান হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েছে। সে বলে আমার বাবার লাশ কেমনে দেশে আনবো, আমাদের তেমন টাকা পয়সা নেই, সরকার কি আমার বাবার লাশ আনতে ব্যবস্থা করবে? সৌদিতে আমাদের কোনো আত্মীয়-স্বজন ও নেই।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২২ বছর আগে পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরাতে সৌদি আরব যায় গিয়াস উদ্দিন মীর। দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকেও কোনরকম ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ও পরিবারের আর্থিক খরচ চালিয়ে কোনরকম চলছিল তার পরিবার। কিন্তু তেমন আর্থিক স্বচ্ছলতা করতে পারেনি। তার এই মৃত্যুতে এখন নি:স্ব তার পরিবার।
গিয়াস উদ্দিন মীরের নিহতের খবর পেয়ে বুধবার সকাল থেকে প্রতিবেশী ও স্বজনরা ভিড় করতে থাকেন তার বাড়িতে। প্রায় ৭ বছর আগে শেষ বার দেশে এসেছিলেন মো. গিয়াস উদ্দিন মীর। পরিবারের সবাইকে কথা দিয়েছিলেন ওমরাহ শেষে আগামী রোববার তার দেশে ফেরার কথা। পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদ করবেন কিন্তু তার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়।
বুধবার দুপুরে সরেজমিনে রাজামেহার গ্রামে মীর বাড়িতে যেয়ে দেখা যায় নিহত গিয়াস উদ্দিনে স্ত্রী রাবেয়া বেগম(৩৬) চিৎকার ও আহাজারী করে বলছেন আমার স্বামীর মরদেহ দেখতে চাই।

স্থানীয়রা জানায়, প্রায় ২২ বছর আগে গিয়াস উদ্দিন মীর চাকরির উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যায়। তার পাঠানো টাকাতেই তার পরিবারে স্ত্রী ও তিন ছেলে মেয়েসহ তার ৮০ বছরের বৃদ্ধ বাবা আব্দুল হামিদ মীর কোন রকম স্বাভাবিক জীবন যাপন করতো। এখন তাদের পরিবারে নেমে এলো দারিদ্রতার ছাপ এবং খুব কষ্টে দিন যাপন করতে হবে।
নিহত গিয়াস উদ্দিন মীরের বাবা হামিদ মীর কান্নাজড়িত কন্ঠে জানান, আমার বড় ছেলে জসিম এক বছর আগে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এখন আবার ছোট ছেলে গিয়াস উদ্দিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমার দুই ছেলে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি।
ভাগ্য বদলের আশায় ছেলেকে সৌদি আরব প্রবাসে পাঠান তিনি। সড়ক দূর্ঘটনায় কেড়ে নেয় তার ছেলের প্রাণ। ছেলের মৃত দেহটি শুধু এখন ফেরৎ চান তিনি।

নিহত গিয়াস উদ্দিন মীরের শশুর খাইরুল আলম জানান, বছর খানেক আগে তার ছোট মেয়ে ফাতেমা আক্তার এর জামাই দুইটি কিডনি বিকল হয়ে মারা যায়। বছর পেরুতেই আজ মেঝো মেয়ে রাবেয়া আক্তারের জামাই গিয়াস উদ্দিন মীর সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে।
প্রসঙ্গত, সৌদি আরবে আসির প্রদেশের আবহা সংযোগে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার পর বাস উল্টে গিয়ে গাড়িতে আগুন ধরে যায়। এই দুর্ঘটনায় গিয়াস উদ্দিন মীরসহ নিহত ১৩ জনের বাড়ীতে চলছে শোকের মাতম। নিহত বাংলাদেশীদের মধ্যে গিয়াস উদ্দিন মীরের গ্রামের বাড়ী দেবীদ্বার উপজেলার রাজামেহার ইউনিয়নে।




















