বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

ওরাই হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার কারিগর

মেজর মোহাম্মদ আলী (অবঃ) সুমন : প্রকাশিত: শনিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২২, ৯:৫২ এএম
ওরাই হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার কারিগর
google news দৈনিক কুমিল্লার ডাক এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন

শিক্ষা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আমাদের সংবিধানে এই অধিকারের কথা উল্লেখ রয়েছে। বর্তমান সরকার শিক্ষার প্রসারে সমাজের সর্বস্তরে কাজ করছে। এই ক্ষেত্রে সফলতাও ব্যাপক। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করেন। ১৯৭৪ সালে কুদরাত-এ-খুদা প্রণীত ‘বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন’ ১৯৮৩ সালের মধ্যে প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করার সুপারিশ করে। ১৯৮১ সালে আলাদাভাবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ২০১৫ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় লিঙ্গবৈষম্যের অবসান ঘটানোর জন্য সব দেশ ঐকমত্যে পৌঁছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি গৃহীত হওয়ার এক যুগেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। শিক্ষা আইন প্রণয়নের কাজও এগিয়ে চলছে। সমন্বিত ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করা একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ। সুশিক্ষিত, আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সরকার পর্যায়ক্রমে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ বাস্তবায়ন করছে। নানাবিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ও গুণগত মানোন্নয়নে বর্তমান সরকার ঈষর্ণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। শিক্ষাকে মানসম্মত, সর্বব্যাপী ও ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের কাছে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবছর ১ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক উৎসব দিবস উদ্্যাপন করা হয়। এই উৎসবের দিনে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল ও এসএসসি স্তরে প্রায় ৩৫ কোটি বই বিনামূল্যে বিতরণ করছে সরকার। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে ব্রেইল পদ্ধতির পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী (চাকমা, মারমা, সাদরি, ত্রিপুরা ও গারো) শিক্ষার্থীর মাঝে নিজ নিজ মাতৃভাষায় মুদ্রিত পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

আমার নির্বাচনি এলাকা রাজধানীর ‘গেটওয়েখ্যাত’ দাউদকান্দি উপজেলা। উপজেলা পরিষদের দু-মেয়াদের চেয়ারম্যান হিসেবে আমার এলাকার প্রাথমিক শিক্ষার মান-উন্নয়ন এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে উপজেলার প্রায় সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছি। এই ক্ষেত্রে নতুন ভবন নির্মাণ ও সংস্কার, স্কুল মাঠ ভরাটের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের ক্রীড়ামুখী ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করা, সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহিদ মিনার নির্মাণ ও জাতীয় দিবসগুলো শ্রদ্ধা-সম্মান সহকারে পালন, স্কুলগুলো নিয়মিত পরিদর্শন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মান উন্নয়নে বিভিন্নভাবে অবদান রাখছেন আমার এলাকার শিক্ষক এবং ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা। নিয়মিত পরামর্শ এবং উন্নয়নের জন্য অর্থিক যোগানসহ দিকনির্দেশনা দিয়ে অবদান রাখছেন আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূইয়া। এই শিক্ষানুরাগীর সার্বিক সহযোগিতায় এগিয়ে চলছে দাউদকান্দি উপজেলার শিক্ষার কার্যক্রম। ইতোমধ্যে সুচারুভাবে যেসব কাজ এগিয়ে নিচ্ছি তা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

১. আমার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে পিছিয়ে পড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কক্ষ নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

২. ব্যক্তিগত এবং বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিশুদের বসবার জন্য টুল-বেঞ্চ ও নানা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে।

৩. উপজেলার সকল স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষানীতি ও দিকনিদের্শনামূলক তথ্যবহুল বই এবং বিভিন্ন প্রকাশনা সরবরাহ এবং প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

৪. প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে আকর্ষণীয় এবং দৃষ্টিনন্দন করার জন্য বৃক্ষরোপণ, ফুলবাগান করা এবং বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি ওয়াল তৈরি করা হয়েছে। বেশির ভাগ স্কুলে ‘মিড ডে’ মিল চালু রাখা হয়েছে। শিশুদেরকে বিভিন্ন সময়ে খেলাধুলার সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। খেলাধুলার জন্য মাঠ সংস্কার, বিকল্প মাঠ ব্যবস্থা করে আন্তঃস্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।

৫. উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্প্রসারণে বিভিন্ন সময়ে রেডিও-টেলিভিশনে এবং ফেসবুকের মাধ্যমে সবার সাথে মতবিনিময়সহ বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া হয় এবং সঠিক পরামর্শগুলো নিয়ে বিদ্যালয়ের কমিটি ও অভিভাবকদের সাথে আলোচনা করে উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

৬. নিয়মিতভাবে কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয় পরিদর্শন করা একটি রুটিন কাজ। এতে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি এবং শিক্ষকগণকে নিয়মিতভাবে সমস্যা সমাধানসহ বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়।

৭.প্রতিটি বিদ্যালয়ে কাব গঠনে সহযোগিতা করা হয়েছে।

৮. আন্তঃবিদ্যালয়ের কাব সমাবেশ আয়োজন করা হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করার উদ্দেশ্যে সভা-সেমিনার-সমাবেশ আয়োজন করা হয়েছে, হচ্ছে।

৯. বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা, ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহযোগিতায় গরিব শিশুদের খাতা, পেনসিল ইত্যাদি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

১০. ব্যক্তিগতভাবে আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষানুরাগীদের আর্থিক সহায়তায় গরিব শিশুদের স্কুল পোশাক এবং জুতা সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে।

১১. প্রতিটি বিদ্যালয়ে বৃত্তিপ্রাপ্ত এবং ভালো ফলাফলের অধিকারী শিশুদেরকে বিভিন্ন সময়ে পুরস্কৃত করা হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে শিক্ষা সফর, জাতির পিতার স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের স্মৃতি জাদুঘর, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহিদ মিনার, জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষণীয় স্থাপনা দেখা এবং এর সম্পর্কে জানার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আমার দায়িত্বের আওতায় আমি চষ্টা করেছি, শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার লক্ষ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, জাতির পিতার জন্মদিন ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবস পালন, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক ব্রিটিশ-উত্তর পাকিস্তানে ১৯৫১ সালে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদে পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর ১৯৫৪ সালে ২১ দফায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়টি ঘোষণা করে। ১৯৫৯ সালের জাতীয় শিক্ষা কমিশন পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন এবং ১৫ বছরের মধ্যে আট বছর মেয়াদি বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তনের সুপারিশ করে। একই সময়ে ইউনেস্কোর উদ্যোগে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ২০ বছর মেয়াদি ‘করাচি পরিকল্পনা’ প্রণীত হয়। তাতে বলা হয়, এই অঞ্চলের ১৫টি দেশে সাত বছর মেয়াদি সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা চালু করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য দেশগুলোর দেশজ উৎপাদনের অন্তত ৭ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি ১৯১৮ সালের মধ্যে দেশে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। তাতে বলা হয়, ‘প্রাথমিক শিক্ষা হবে সর্বজনীন, বাধ্যতামূলক, অবৈতনিক এবং সবার জন্য একই মানের।’ ২০১০-১১ সালের মধ্যে প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি ১০০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বলা হয়: কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি সব ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বাধ্যতামূলক করা; মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর দেশাত্মবোধের বিকাশ ও দেশ গঠনমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করা; শিশুর মনে ন্যায়বোধ, কর্তব্যবোধ, শৃঙ্খলা, শিষ্টাচার, অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, মানবাধিকার, কৌতূহল, প্রীতি, সৌহার্দ, অধ্যবসায় ইত্যাদি নৈতিক ও আত্মিক গুণাবলি অর্জনে সহায়তা করা; বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিমনস্ক করা এবং কুসংস্কারমুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহিত করা; শিক্ষার্থীকে জীবনযাপনের জন্য আবশ্যকীয় জ্ঞান, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, জীবন-দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ, সামাজিক সচেতনতা অর্জন এবং পরবর্তী স্তরের শিক্ষা লাভের উপযোগী করে গড়ে তোলা। কায়িক শ্রমের প্রতি আগ্রহ ও মর্যাদাবোধ এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারণা সৃষ্টি; আদিবাসীসহ সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্ব-স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা; সব ধরনের প্রতিবন্ধীসহ সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত ছেলেমেয়েদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আমার এই বিষয়টি তুলে ধরার উদ্দেশ্য হচ্ছে, শিক্ষার প্রসারের ধাপটি এখন কোন পর্যায়ে তা স্পষ্ট করা। শেখ হাসিনা সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায়। এই দৃষ্টান্ত আজ বহু দেশের জন্য অনুকরণীয়। এ কথা সত্য যে, আমাদের বহুধাবিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থার (কমিউনিটি বিদ্যালয়, রেজিস্ট্রিকৃত ও রেজিস্ট্রিহীন বিদ্যালয়, সরকারি বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা ইত্যাদি) মধ্যে বিরাজমান প্রকট বৈষম্য দূর ও সমন্বয় জরুরি।

আমি মনে করি, শিক্ষার মানোন্নয়নসহ শিক্ষা ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা ও শিক্ষা কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা আইন প্রণয়ন, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধকল্পে সফল উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। এই ক্ষেত্রে আমরা সফল হলে দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী হবে জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার এক-একজন যোগ্য সৈনিক। ওরাই হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার কারিগর। আমি তাদের সে চোখেই দেখি। আমাদের প্রত্যাশা আমরা সে পথেই এগোচ্ছি।

লেখক :
মেজর মোহাম্মদ আলী (অবঃ) সুমন।
চেয়ারম্যান : দাউদকান্দি উপজেলা পরিষদ।

অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহী খিড়াই নদী

দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি : প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:২২ পিএম
অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহী খিড়াই নদী

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বিটেশ্বর ইউনিয়নের বিরবাগ গোয়ালী ও দুর্গাপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী খিড়াই নদী কচুরিপানা ও আবর্জনায় প্রায় সম্পূর্ণ ঢেকে গেছে। নদীর বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে কচুরিপানা ও বর্জ্য জমে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে স্থানীয় পরিবেশ ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। নদীটি দূষণমুক্ত করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও পরিবেশকর্মীদের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বাপা দাউদকান্দি উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান তালুকদার খিড়াই নদীর বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। নদী ও জলাধারকে কচুরিপানা ও বর্জ্যমুক্ত করে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সুধী সমাবেশ ও আলোচনা সভা আয়োজনের স্থান নির্ধারণ করতেই এ পরিদর্শন করা হয়।

বাপা কেন্দ্রীয় কমিটির আজীবন সদস্য, কুমিল্লা জেলা কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও দাউদকান্দি উপজেলা শাখার প্রধান উপদেষ্টা পরিবেশবিদ অধ্যাপক মতিন সৈকত এবং উপজেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম স্বপনের পরামর্শক্রমে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।

পরিদর্শনকালে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা, নৈয়াইর সাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক এবং বাপা দাউদকান্দি শাখার উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিন সিকদারের সঙ্গে বাপা নেতৃবৃন্দ মতবিনিময় করেন। এ সময় নদীর বর্তমান অবস্থা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং দ্রুত কচুরিপানা ও আবর্জনা অপসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়।

বাপা দাউদকান্দি উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান তালুকদার বলেন, নদী শুধু জলপ্রবাহ নয়; এটি প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। খিড়াই নদীকে বাঁচাতে নিয়মিত পরিচর্যা, নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ এবং দ্রুত কচুরিপানা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য ও নির্মল পরিবেশ গড়ে তুলতে দল-মতনির্বিশেষে স্থানীয় জনগণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা আশা করছেন, প্রশাসনিক সহায়তা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে খিড়াই নদী থেকে কচুরিপানা ও আবর্জনা অপসারণ করে এর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

পৈতৃক জমি নিয়ে বিরোধ, বসতবাড়ি ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ

চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি : প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:০৯ পিএম
পৈতৃক জমি নিয়ে বিরোধ, বসতবাড়ি ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে বসতবাড়ির টিনের বেড়া ও জানালার থাই গ্লাস ভাঙচুর, ভবনের পাশে মাটি কেটে ঝুঁকি তৈরি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চৌদ্দগ্রাম থানায় দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চৌদ্দগ্রাম মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ আরিফ হোছাইন। উপজেলার উজিরপুর ইউনিয়নের জগমোহনপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

থানায় দায়ের করা অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার শীতলিয়া মৌজায় আব্দুল কুদ্দুছের বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ-বণ্টনের পর তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ অংশ ভোগদখল করে আসছেন। তবে সম্পত্তির একটি অংশ নিয়ে তাঁর সৎ ভাই আব্দুল ওয়াদুদের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছে। এ নিয়ে আদালতে একটি মামলাও চলমান রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে আব্দুল ওয়াদুদসহ কয়েকজন ব্যক্তি এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জন বিরোধপূর্ণ সম্পত্তিতে গিয়ে আব্দুল কুদ্দুছের বসতবাড়ির চারপাশের টিনের বেড়া ও জানালার থাই গ্লাস ভাঙচুর করেন। এ সময় পাকা বসতঘরের পূর্ব পাশে মাটি কেটে নেওয়া হয়। এতে দোতলা ভবনটি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারী। বাধা দিতে গেলে তাঁকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি সুষ্ঠুভাবে ভাগ-বণ্টন করে যার যার অংশ বুঝে নেওয়ার জন্য তিনি একাধিকবার অনুরোধ করেছেন। তাঁর দাবি, সৎ ভাই নিজের অংশ অন্য মৌজায় নিয়ে প্রায় ২০ বছর আগে বিক্রি করেছেন। অন্যদিকে, তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে এই জমি ভোগদখল করে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, তিনি তাঁর বাবার প্রথম সংসানের ছেলে। তাঁর দাদা মারা যাওয়ার আগেই বাবা মারা যান। এরপর সৎ ভাই-বোনসহ ১০ জনের সংসারের খরচ তিনি কষ্ট করে চালিয়েছেন। বণ্টন অনুযায়ী ওই জমিতে তাঁর অংশ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভাইয়েরা নিজেদের অংশে বসতঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। ২০২৩ সালে আর্থিক সংকটের কারণে নিজের অংশের জমি খারিজ খতিয়ান করে বিক্রি করেছেন। জমি নিয়ে তাঁর ভাইয়েরাই ঝামেলা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভেকু দিয়ে মাটি কাটার বিষয়ে ফারুক বলেন, নিজের পৈতৃক সম্পত্তিতে বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য মাটি কেটে ভরাট করছেন তিনি। কুদ্দুছের ঘরের পেছনে প্রায় ১০ ফুট জায়গা রেখে মাটি কাটা হচ্ছে। ভবনের ক্ষতি করার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য তাঁর নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

চৌদ্দগ্রাম মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ আরিফ হোছাইন বলেন, উজিরপুর ইউনিয়নের শীতলিয়া এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দেবীদ্বারে ন্যায় বিচারের দাবীতে মানববন্ধন; ওসি ও এসআই অজয়ের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

মো: বিল্লাল হোসেন: প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩৫ এএম
দেবীদ্বারে ন্যায় বিচারের দাবীতে মানববন্ধন; ওসি ও এসআই অজয়ের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

আমি আমার স্ত্রী হত্যার বিচার চাই। পুলিশি হয়রানির আতঙ্কে আমার স্ত্রী হাসনা বেগম (৫৬) হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। অর্থের অভাবে আমার স্ত্রীর উন্নত চিকিৎসা করাতে পারি নাই। প্রতিপক্ষের টাকার গরমে থানা পুলিশ আমাদের মামলা নেয় নাই। আসামীরা সহজে জামিন পেতে এবং মামলা থেকে খালাস পেতে নিলাফুলা-জখম দেখিয়ে নিজ মনগড়া এজাহার লিখে আমার ছেলের স্বাক্ষর নিয়ে মামলা রুজু করে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবীদ্বার নিউমার্কেট মুক্তিযোদ্ধা চত্বরের স্বাধীনতা স্তম্ভের সংলগ্ন সড়কে আয়োজিত মানববন্ধন চলাকালে নিহত হাসনা বেগমের স্বামী আব্দুল আজিজ এসব কথা বলেন।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে মাছ ধরার সময় তর্কাতর্কি কেন্দ্র করে দেবীদ্বার পৌরসভার ভোষণা গ্রামের আব্দুল আজিজের বাড়িতে ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নবী নেওয়াজ সহ বহিরাগত সন্ত্রাসী হামলায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারপূর্বক বিচারের দাবিতে এবং একই ঘটনায় থানা পুলিশের যোগসাজশে করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে এলাকাবাসীর আয়োজনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধনে আব্দুল আজিজ আরো বলেন, প্রতিপক্ষের মামলা গ্রহণ করে আমাদের হয়রানি করে। ওই মামলার তদন্তে ৬ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) শ্রী অজয় চক্রবর্তী বাড়িতে এসে আমার ছেলে (মামলার বাদী) আল আমিন ভ্যান চালিয়ে মামলা চালাতে পারবে না বলে, মামলা তুলে নিয়ে মিমাংসায় চলে যেতে চাপ দিতে থাকেন, বয়স হলে দাত এমনিতেই পড়ে যাবে, তাদের কথা-বার্তায় আমার স্ত্রী সন্তানদের গ্রেফতার আতঙ্কে হার্ট এটাকে ৩ দিন চিকিৎসাধীন থেকে ৯ অক্টোবর কু.মে.ক হাসপাতালে মারা যান।

মো. শাহজালাল বলেন, আক্তার হোসেনের ছেলে শুভ বাড়ির পাশে আমাদের একটি গর্ত সিচে মাছ ধরছিল, ঐসময় একই বাড়ির মৃত সিরাজুল ইসলামের ছেলে ট্রাক্টর চালক নবী নেওয়াজ (৩৮) শুভর মাছগুলো ফেলে দেয়। এ নিয়ে শুভ ও নবী নেওয়াজের মধ‍্যে বাগবিতন্ডা ও হাতাহাতি হয়। এ ঘটনায় ২০ অক্টোবর বিকেলে নবী নেওয়াজ ৬টি সিএনজি যোগে বহিরাগত ভাড়াটে সন্ত্রাসী প্রায় ৫০/৬০ জন নিয়ে তাদের বাড়িতে অতর্কিত হামলা, ভাংচুর, লুটপাট চালায়।
আবদুল আজিজের ছেলে গুরুতর আহত আক্তার হোসেনের স্ত্রী শাহিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী তাদের কাছে হাত জোর করে-আব্বা ডেকেও রক্ষা পায়নি, আমার ছেলে শুভ তার বাবাকে আর না মারতে প্রাণ ভিক্ষা চায়, তাকেও কুপিয়ে গুরতর আহত করে, আমার প্রতিবন্ধী মেয়েকেও মারে, আমি আমার স্বামী ও সন্তানের প্রাণ ভিক্ষা চাইতে গেলে ওরা আমাকেও কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। আমার স্বামী তাদের মারধরে ঘরে পয়খানা- প্রশ্রাব করে দেয়। তারা আমার স্বামীর নিচের চোয়ালের তিনটি দাত ভেঙ্গে ফেলে, কুপিয়ে গুরুতর জখম করে মৃত ভেবে ফেলে যায়। আমার স্বামীর পায়ের অংশে কাটায় ৩৮ টি সেলাই দিতে হয়, ৩টি দাত ফেলে দিলেও এসব কথা মামলায় উল্লেখ করেনি। মামলায় ফুলা জখম দেখিয়েছে। অর্থাভাবে স্বামীর চিকিৎসা করতে পারছিনা, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম অসুস্থ‍ স্বামী কাজে যেতে পারছেনা, তাই আজ প্রায় একমাস আমরা মানুষের সহায়তায় অর্ধাহার অনাহারে আছি। ভবিষ‍্যৎ কি হবে জানিনা।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, কাজী লোকমান হোসাইন, মোঃ আউয়াল খাঁন, মোঃ শাহজালাল, মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, ভুক্তভোগী পরিবার থেকে আব্দুল আজিজ, শাহিনা বেগম, কামরুল হাসান প্রমুখ। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপজেলা সদরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
মানববন্ধনে বক্তরা বলেন, মাছ ধরা নিয়ে হাতাহাতি ও বাকবিতন্ডায় বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে একটি দরিদ্র পরিবারকে মারধর, হামলা ও ঘরবাড়ি ভাংচুর এবং লুটপাট করে নিঃস্ব করে দিয়েছে নবী নেওয়াজ, আব্দুল কাদের,দুলাল মিয়া, রাকিব@সাগর ও মো: ওমরসহ তার ভাড়া করা সন্ত্রাসীরা। অতি দ্রুত আসামী পক্ষের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও সন্ত্রাসী হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবী জানান। তাদের দাবী না মানা হলে পরবর্তীতে বৃহৎ আন্দোলনের হুশিয়ার দেন।

এবিষয়ে দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, মামলার এজাহার ওনারা লিখে এনেছেন। আমরা মামলা রেকর্ড পূর্বক আসামী আটক করে আদালতে সোপর্দ করেছি, বিজ্ঞ আদালত যদি আসামীকে জামিন দেয় সেক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার নেই। মামলার এজাহারে যদি দাঁত পরার বিষয় বা অন্য কোন গুরুতর জখমের কথা বাদ পরে থাকে তদন্তে এড করে দেওয়া যাবে সমস্যা নেই। তাছাড়া মারামারির ঘটনায় কাউন্টার মামলা হয়, যা অপর পক্ষ করেছে।

×