কুমিল্লা আদালত ভবনের লিফট নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, আতঙ্কে বিচারপ্রার্থী-আইনজীবীরা
Oplus_131072
কুমিল্লা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা লিফট নিয়ে নিম্নমান ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়মিত লিফট বিকল হয়ে যাওয়া এবং মাঝপথে যাত্রী আটকে পড়ার ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আদালতে আসা সাধারণ মানুষ।
১০ তলা বিশিষ্ট চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট
আদালত ভবনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন আদালত ও বিচারিক কার্যক্রম। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এ ভবনে যাতায়াত করেন। কুমিল্লা বিচার বিভাগের সরকারি ওয়েবসাইটেও ভবনটিতে একাধিক বিচারিক আদালত ও দপ্তর থাকার তথ্য রয়েছে।
প্রায় এক ঘণ্টা লিফটে আটকে নাজিরসহ কয়েকজন
সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের পঞ্চম তলায় যাওয়ার সময় দ্বিতীয় তলায় লিফটে আটকে পড়েন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের নাজির আবদুল আলীমসহ কয়েকজন। প্রায় এক ঘণ্টা পর তাদের লিফট থেকে বের করা সম্ভব হয়।
আবদুল আলীম বলেন, “২০২৩ সালেও একবার লিফটে আটকে পড়েছিলাম। সোমবার আবারও দ্বিতীয় তলায় আটকে যাই। আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিলেন। সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। আর কিছুক্ষণ আটকে থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।”
তার অভিযোগ, নিম্নমানের লিফট স্থাপনের কারণেই বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
প্রতিদিনই লিফট আটকে যাওয়ার অভিযোগ
কুমিল্লার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. কাইমুল হক রিঙ্কু বলেন, “প্রতিদিনই লিফট আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন আইনজীবী লিফটে আটকে আহত হয়েছেন। একজন সহকর্মীও আহত হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আমি প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানিয়েছি।”
তিনি বলেন, লিফট স্থাপনে অনিয়ম হয়ে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
২০১৮ সালে স্থাপনের পর থেকেই ত্রুটি?
কুমিল্লা গণপূর্ত কার্যালয়ের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আদালত ভবনে লিফট দুটি ২০১৮ সালে স্থাপন করা হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এর আগে চলতি বছরের জুলাই মাসেও আদালত ভবনের দুটি লিফট দীর্ঘদিন বিকল থাকার বিষয়টি নিয়ে দুর্ভোগের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তখন গণপূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে নতুন লিফট স্থাপনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর কথা জানানো হয়।
তবে লিফট স্থাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, কাজের মান ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত বা চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না—তা স্পষ্ট নয়। ফলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে যথাযথ তদন্তের দাবি উঠেছে।
প্রকৌশলীদের পরিদর্শন, নতুন লিফটের প্রস্তাব
জেলা ও দায়রা জজ আদালত, কুমিল্লার নাজির মুমিনুল ইসলাম জানান, গত সপ্তাহে প্রকৌশলীরা আদালত ভবনে এসে লিফট পরিদর্শন করেছেন। কিছুদিনের মধ্যেই নতুন লিফট স্থাপন করা হবে বলে তারা আশ্বাস দিয়েছেন।
কুমিল্লা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান হিরা বলেন, “গত সপ্তাহে আমরা মেরামত করেছি। আদালত থেকে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার দুটি লিফট বন্ধ। নতুন লিফট লাগানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।”
এর আগে গণপূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, আদালত ভবনের লিফটগুলো বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটিতে ভুগছে এবং নতুন লিফট স্থাপনের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে।
মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন
কুমিল্লা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শরিফুল ইসলাম বলেন, “দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত লিফট যদি বারবার মাঝপথে আটকে যায়, তাহলে এর মান নিয়ন্ত্রণ ও কাজের তদারকি হয়েছিল কীভাবে—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
লিফট স্থাপনের সময় কী ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছিল, কাজের মান যাচাই করা হয়েছিল কি না এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের দাবি জানান তিনি।
দ্রুত তদন্ত ও নিরাপদ লিফটের দাবি
আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জনসমাগমপূর্ণ স্থাপনায় লিফটের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের দাবি, লিফটের বারবার বিকল হওয়ার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে কারিগরি তদন্ত করা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দ্রুত নতুন ও নিরাপদ লিফট চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।



















