বিশ্ব পর্যটন দিবসে কুমিল্লায় ভ্রমণ সাহিত্যের আবেগঘন আসর
ভ্রমণ মানেই শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে যাওয়া নয়; ভ্রমণ মানে অচেনাকে চেনা, অদেখাকে দেখা এবং নতুন মানুষ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। সেই অভিজ্ঞতা কখনো গল্প, কখনো কবিতা, কখনো স্মৃতি—আবার কখনো হয়ে ওঠে সাহিত্য।
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে এমনই ভ্রমণের স্মৃতি, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার গল্পে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল কুমিল্লার ‘জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডা’। আড্ডার ১১১তম পর্বে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, আনন্দ, বিস্ময় ও উপলব্ধির কথা উঠে আসে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টায় কুমিল্লা কান্দিরপাড় নিউমার্কেটের চতুর্থ তলায় জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডার অস্থায়ী কার্যালয়ে শুরু হয় বিশেষ এ আয়োজন। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা আড্ডাটি একসময় পরিণত হয় স্মৃতি, গল্প, সাহিত্য ও ভালোবাসায় মোড়ানো এক প্রাণবন্ত ভ্রমণসভায়।
আড্ডার কর্ণধার হালিম আব্দুল্লাহর প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় আমন্ত্রিত অতিথিরা তাঁদের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা, পর্যটনের নানা দিক, ভ্রমণ সাহিত্যের গুরুত্ব এবং মানুষের জীবনে ভ্রমণের প্রভাব নিয়ে কথা বলেন। তাঁদের কথায় উঠে আসে দেশের বিভিন্ন জনপদ থেকে শুরু করে দূরদেশের প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপনের নানা গল্প।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা ইউনিটের লেখক ও গবেষক প্রবীর বিকাশ সরকার, সাংস্কৃতিক কর্মী তপন সেনগুপ্ত, ‘লঙ্কায় ভ্রমণ কাণ্ড’ গ্রন্থের লেখক ওয়ালিউল্যাহ রিপন, কুমিল্লা বিউবোর সহকারী প্রধান প্রকৌশলী (অব.) মো. মোখলেছুর রহমান, নাট্য ব্যক্তিত্ব শাহজাহান চৌধুরী, বাসদ জেলা সমন্বয়ক আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার, কুমিল্লা ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক মো. আফজল হোসেন, কুমিল্লা সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান মামুন, কুমিল্লা হার্ট কেয়ার ফাউন্ডেশনের কোষাধ্যক্ষ কমরেড আনোয়ার হোসেন, ‘নিরাপদ চালক চাই কুমিল্লা’র সভাপতি মো. আজাদ সরকার লিটন, জাতীয় কবিতা পরিষদ কুমিল্লার সহ-সভাপতি শিপন হোসেন মানব, কবি ও গবেষক সরদার মোজাম্মেল, বাংলাদেশ ব্রাহ্মণ যুব কিশোর সংসদ, কুমিল্লা মহানগর শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক শ্যামা রানী চক্রবর্তী ও তাঁর মা রাধা রানী বৈষ্ণবী, কমলাঙ্ক সাহিত্য একাডেমির দপ্তর সম্পাদক ভূইয়া তাজুল ইসলাম এবং জনান্তিক নাট্য সংগঠনের নাট্যকর্মী সানজিদা রুমানা প্রমুখ।
শুধু উপস্থিত অতিথিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না আয়োজনটি। ফেসবুকের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাহিত্যপ্রেমী, সংস্কৃতিকর্মী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষও এতে যুক্ত হন। ফলে নিউমার্কেটের ছোট্ট অস্থায়ী কার্যালয়টি মুহূর্তেই যেন ছড়িয়ে পড়ে ভার্চুয়াল জগতের বিস্তৃত পরিসরে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বক্তারা বলেন, ভ্রমণ মানুষের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে। পরিচিত গণ্ডির বাইরে গিয়ে নতুন কোনো জনপদ, সংস্কৃতি, ভাষা, ইতিহাস কিংবা মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখলে মানুষের ভাবনার জগতও বদলে যায়। সেই দেখা ও অনুভূতি যখন শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তখন জন্ম নেয় ভ্রমণ সাহিত্য।
আড্ডায় ভ্রমণকে শুধু বিনোদনের বিষয় হিসেবে না দেখে জীবন ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, একজন ভ্রমণকারী কোনো স্থানকে যে চোখে দেখেন, একজন লেখক অনেক সময় সেই একই স্থানকে দেখেন ভিন্ন অনুভূতির আলোয়। ফলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি হয়ে থাকে না; তা হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসের দলিল, মানুষের গল্প কিংবা সাহিত্যের উপাদান।
বিভিন্ন বক্তার বক্তব্যে উঠে আসে তাঁদের দেখা ও জানা নানা ভ্রমণকাহিনি। কোথাও ছিল প্রকৃতির সৌন্দর্য, কোথাও ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা, আবার কোথাও উঠে আসে মানুষের জীবনসংগ্রাম ও সংস্কৃতির পরিচয়। এসব গল্প শুনতে শুনতে উপস্থিত শ্রোতারাও যেন কিছুক্ষণের জন্য পাড়ি দেন অচেনা কোনো শহর, জনপদ, পাহাড়, সমুদ্র কিংবা সীমান্তের ওপারের কোনো ভূখণ্ডে।
পুরো আড্ডাজুড়ে ছিল প্রাণের উচ্ছ্বাস। কেউ স্মৃতিচারণ করেছেন, কেউ নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন, আবার কেউ কথা বলেছেন ভ্রমণ সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাবনা নিয়ে। কথার সঙ্গে কথার যোগসূত্রে তৈরি হয় আন্তরিক এক পরিবেশ—যেখানে বয়স, পেশা কিংবা পরিচয়ের ভিন্নতা ছাপিয়ে সবাই মিলিত হন সাহিত্য ও ভ্রমণের ভালোবাসায়।
দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এ আয়োজনে কথার পাশাপাশি ছিল মিষ্টিমুখ ও চা-আড্ডা। এক কাপ চায়ের উষ্ণতায় জমে ওঠে ভ্রমণের গল্প; মিষ্টির স্বাদে আরও মধুর হয়ে ওঠে সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের মিলনমেলা। আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে আয়োজনটি হয়ে ওঠে আপনজনের সঙ্গে বসে গল্প করার মতোই স্বতঃস্ফূর্ত ও আন্তরিক।
‘জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডা’র ১১১তম পর্ব তাই শুধু একটি সংখ্যা পূরণের আয়োজন হয়ে থাকেনি। বিশ্ব পর্যটন দিবসে এটি হয়ে উঠেছে ভ্রমণ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানুষের হৃদয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির এক সুন্দর প্রয়াস।
ভ্রমণ মানুষকে দূরে নিয়ে যায়, আবার কখনো সেই দূরত্বই মানুষকে নিজের আরও কাছে ফিরিয়ে আনে। অচেনা পথের গল্প বলতে বলতে মানুষ খুঁজে পায় নিজের ভেতরের আরেক পৃথিবীকে। আর সেই অনুভূতি যখন সাহিত্যিকরা শব্দে বন্দি করেন, তখন পথের ধুলো, নদীর স্রোত, পাহাড়ের নীরবতা, সমুদ্রের গর্জন কিংবা কোনো অচেনা মানুষের হাসিও হয়ে ওঠে সাহিত্যের অংশ।
কুমিল্লার মাটিতে অনুষ্ঠিত জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডার এবারের আসর যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—পথ শেষ হয়ে যায়, ভ্রমণ শেষ হয় না; কোনো কোনো ভ্রমণ পথের শেষে গিয়ে সাহিত্যের পাতায় নতুন করে শুরু হয়।
কিছু গল্প, কিছু স্মৃতি আর আবারও একসঙ্গে বসার প্রত্যাশা নিয়ে শেষ হয় প্রাণের এ আড্ডা। জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডার ১১১তম পর্ব তাই কুমিল্লার সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে ভ্রমণ সাহিত্যের এক আন্তরিক ও স্মরণীয় সন্ধ্যা হয়ে রইল।