কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ৭৬ কেজি গাঁজা উদ্ধারের দাবি করে প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, অভিযানের সময় একটি কাভার্ড ভ্যান আটক করে তল্লাশি চালিয়ে ৩৮টি পোটলায় বিপুল পরিমাণ গাঁজা উদ্ধার করা হয় এবং চালক ও তার সহযোগীকেও আটক করা হয়েছিল। তাদের অভিযোগ, পরে অর্থের বিনিময়ে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়া হয় এবং উদ্ধার করা গাঁজার বড় একটি অংশ থানায় জমা দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া চৌদ্দগ্রাম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) লিটন চাকমার দাবি, মাদক কারবারিরা পুলিশের গাড়ি দেখে গাঁজার চারটি থলে ফেলে পালিয়ে যায়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কাভার্ড ভ্যান আটক করে ৭৬ কেজি গাঁজা উদ্ধারের যে দাবি করা হচ্ছে, তার সঙ্গে তার বক্তব্যের মিল নেই।
দুই পক্ষের এই ভিন্ন বক্তব্যের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে—২৫ সেপ্টেম্বরের ওই অভিযানে প্রকৃতপক্ষে কত কেজি গাঁজা উদ্ধার হয়েছিল, কোথা থেকে উদ্ধার হয়েছিল এবং মামলার এজাহারে ১৬ কেজি গাঁজা কেন উল্লেখ করা হলো?
ঘটনাটি ঘটে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম এলাকায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ওইদিন সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে পুলিশের একটি দল নোহা গাড়ি নিয়ে চৌদ্দগ্রামের সিতলিয়া রাস্তার মাথা এলাকায় একটি কাভার্ড ভ্যানকে ধাওয়া করে আটক করে। পরে কাভার্ড ভ্যানে তল্লাশি চালানো হয়।
সূত্রগুলোর দাবি, কাভার্ড ভ্যান থেকে প্রায় দুই কেজি ওজনের ৩৮টি পোটলায় মোট ৭৬ কেজি গাঁজা পাওয়া যায়। এ সময় কাভার্ড ভ্যানের চালক ও তার সহযোগীকেও আটক করা হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে ওইদিন রাতে এসআই লিটন চাকমা বাদী হয়ে যে মামলা দায়ের করেন, সেখানে ১৬ কেজি গাঁজা উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে ঘটনাস্থল হিসেবে নোয়াবাজার মহাসড়কের পাশের এলাকা উল্লেখ করা হয়। সেখানে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি বস্তায় করে ১৬ কেজি গাঁজা ফেলে পালিয়ে যায় বলেও উল্লেখ রয়েছে।
ফলে এজাহারের তথ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের বর্ণনার পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ৭৬ কেজি উদ্ধারের দাবি সত্য হলে বাকি ৬০ কেজি গাঁজা কোথায় গেল—এ প্রশ্নের উত্তরও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রগুলোর আরও দাবি, অভিযানের সময় কাভার্ড ভ্যানের চালক ও তার সহযোগীকে আটক করা হয়েছিল। পরে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া গাঁজার একটি বড় অংশ থানায় জমা না দিয়ে সরিয়ে ফেলার অভিযোগও উঠেছে এসআই লিটন চাকমার বিরুদ্ধে।
গোপন সূত্রের বরাতে আরও দাবি করা হয়েছে, কথিত ৭৬ কেজি গাঁজার মধ্যে প্রায় ৬০ কেজি একটি মাদক কারবারির কাছে বিক্রি করা হয়। এর বিনিময়ে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলেও সূত্রটির দাবি। তবে এই অর্থ লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
সূত্রটির আরও দাবি, ওই অর্থের একটি অংশ থেকে ৬০ হাজার টাকা ‘সোর্স মানি’ হিসেবে দেওয়ার কথা ছিল। পরে সোর্স মানির পরিমাণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সোর্সের সঙ্গে এসআই লিটন চাকমার বিরোধ তৈরি হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা সাক্ষীদের নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এজাহারে সাক্ষী হিসেবে যাদের নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে তাদের পরিচয় ও ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এ দাবিরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
এর আগে গত ৩১ আগস্ট চৌদ্দগ্রাম থানার কালিকাপুর ইউনিয়নের বদরপুর এলাকায় পুলিশের একটি অভিযানে ১০০ কেজি গাঁজা উদ্ধারের ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। অভিযোগকারীদের দাবি ছিল, ওই ঘটনায় এজাহার, জব্দ তালিকা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার মধ্যে উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ নিয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে।
এরই মধ্যে ২৫ সেপ্টেম্বরের নতুন ঘটনাকে কেন্দ্র করে চৌদ্দগ্রাম থানার মাদক উদ্ধার ও জব্দ প্রক্রিয়া নিয়ে আবারও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কত কেজি গাঁজা উদ্ধার হয়েছিল, কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, কারা আটক হয়েছিল, উদ্ধার করা মাদক কোথায় রাখা হয়েছে এবং এজাহারে ১৬ কেজি গাঁজা উল্লেখের কারণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে এসআই লিটন চাকমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মাদক কারবারিরা পুলিশের গাড়ি দেখে হঠাৎ করে গাঁজার চারটি থলে ফেলে চলে যায়।
কাভার্ড ভ্যানের চালকের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে চালকের ঠিকানা জানতে চান এবং বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বিব্রত বোধ করেন বলে জানান।
তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার সঙ্গে এসআই লিটন চাকমার বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত সত্য উদঘাটনে জব্দ তালিকা, এজাহার, মামলার নথি, থানায় জমা দেওয়া আলামতের হিসাব, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
মাদক উদ্ধারের মতো গুরুতর ঘটনায় উদ্ধারকৃত আলামতের পরিমাণ ও মামলার নথির মধ্যে কোনো অসঙ্গতি থাকলে তার ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অর্থ লেনদেন, মাদক আত্মসাৎ ও আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগগুলো সত্য কি না, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।