সিজারের পর পেটে গজ, নার্স বীথির মৃত্যু; ৫৫ হাজার টাকায় ‘মামলা না করার’ চুক্তি!
Oplus_131072
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগের পর মারা গেছেন নার্সিং শিক্ষার্থী ও প্রশিক্ষণার্থী নার্স বীথি আক্তার। মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ‘মামলা না করার শর্তে’ তাঁর স্বামীকে ৫৫ হাজার টাকা দেওয়ার একটি চুক্তিপত্রের তথ্য সামনে এসেছে। তবে এ অর্থ দেওয়ার বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেননি। বীথির চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সিজারের পর থেকেই অসুস্থতা
গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বীথি আক্তারের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারে ডা. তামান্না আক্তার ও ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দু যুক্ত ছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। ওই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন বীথি।
অস্ত্রোপচারের পাঁচ দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে স্বামীর বাড়িতে চলে যান তিনি। এরপর থেকেই তাঁর শারীরিক অসুস্থতা ও নানা জটিলতা দেখা দিতে থাকে। একপর্যায়ে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও গুরুতর কোনো সমস্যা নেই বলে তাঁকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে প্রায় দেড় মাস পর দুটি বেসরকারি হাসপাতালে দুই দফায় আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। পরিবারের দাবি, ওই পরীক্ষায় বীথির পেটের ভেতরে গজ কাপড় থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে।
দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারে বের করা হয় গজ
গত ১২ জুলাই বীথিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। তিন দিন পর, ১৫ জুলাই সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলুল হক শোভন ও সঞ্জয় সাহা তাঁর দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার করেন। এ সময় পেটের ভেতর থেকে গজ কাপড় বের করা হয়।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তত দিনে পেটের ভেতরের নাড়িতে পচন ও সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল। ২২ জুলাই তাঁকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়। পরে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত আবারও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ৪ অক্টোবর আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মারা যান বীথি।
মৃত্যুর পর সামনে এল ৫৫ হাজার টাকার চুক্তিপত্র
বীথির মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি লিখিত চুক্তিপত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করা ওই চুক্তিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের বিনিময়ে ভবিষ্যতে রোগীর পরিবার কোনো আইনি ব্যবস্থা নেবে না বা আর্থিক দাবি করবে না—এমন শর্ত উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। নথিতে বীথির স্বামী রাকিবুল ইসলামের স্বাক্ষর রয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক সহায়তার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে রাকিবুল ইসলাম দাবি করেন, ওই সময় তাঁর কাছে মাত্র ২০ হাজার টাকা ছিল। হাসপাতালের বকেয়া বিলসহ বিভিন্ন আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ে তিনি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন বলে জানান। পরিবারের ভবিষ্যৎ ও আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সে সময় তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে তাঁর বক্তব্য।
তবে চুক্তিপত্রে ৫৫ হাজার টাকার উল্লেখ থাকলেও রাকিবুলের বক্তব্যে ৫০ হাজার টাকা গ্রহণের কথা এসেছে। অর্থের পরিমাণের এই পার্থক্য এবং চুক্তির পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
টাকা দেওয়ার বিষয়টি জানা নেই: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানস কৃষ্ণ কুন্ডু বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের টাকা দেওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে বিষয়টি শুনেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, বীথির চিকিৎসার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি, ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন
বীথির চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক। সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাসকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটিকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বাঁচার আকুতি জানিয়েও শেষ রক্ষা হলো না
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক জটিলতায় ভুগতে থাকা বীথি গত ২ অক্টোবর বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর দিন দুপুরে বীথির মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়।
বীথি আক্তার রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট জ্যোতিনবর্দিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী। তিনি ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করতেন।
একটি অস্ত্রোপচারের পর শুরু হওয়া অসুস্থতা, পরবর্তী চিকিৎসা, সংক্রমণ ও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের অভিযোগের পাশাপাশি এখন সামনে এসেছে আর্থিক সমঝোতার প্রশ্নও। তবে চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছিল কি না এবং অর্থের বিনিময়ে কোনো আইনি দাবি থেকে বিরত থাকার চুক্তি কী পরিস্থিতিতে করা হয়েছিল, তা নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই এসব প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা।

























