প্রবীণ বয়সের প্রস্তুতি শুরু হোক আজ থেকেই
Oplus_131072
যৌবনের সুস্থ অভ্যাসই হোক বার্ধক্যের নিরাপদ ভবিষ্যৎ
আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য—“The Age of Longevity: Rethinking Systems for Longer Lives”, অর্থাৎ “দীর্ঘায়ুর যুগে দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোকে নতুনভাবে ভাবা”। দীর্ঘায়ু মানবসভ্যতার একটি বড় অর্জন হলেও দীর্ঘ জীবন যেন সুস্থতা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদার সঙ্গে কাটে—সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ২০২৫ সালের প্রায় ১.২২ বিলিয়ন থেকে ২০৫০ সালে প্রায় ২.১ বিলিয়নে পৌঁছাতে পারে।
১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রতিবছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯১ সাল থেকে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।
প্রবীণরা শুধু একটি পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য নন; তাঁরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, মূল্যবোধ ও জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ধারক। তাই প্রবীণদের যত্ন নেওয়া শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়—এটি একটি সুস্থ, মর্যাদাপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গঠনের অপরিহার্য অংশ।
আজকের তরুণই আগামীর প্রবীণ
আমরা অনেক সময় মনে করি, বার্ধক্য জীবনের শেষ অধ্যায়। বাস্তবে বার্ধক্য জীবনের একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। কেমন হবে সেই বয়স, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে জীবনের আগের দশকগুলোর স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক প্রস্তুতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং আর্থিক পরিকল্পনার ওপর।
তাই প্রবীণ হওয়ার প্রস্তুতি প্রবীণ বয়সে নয়—যৌবন ও মধ্যবয়স থেকেই শুরু করা প্রয়োজন।
যৌবন ও মধ্যবয়সে কী করা প্রয়োজন?
১. নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম
নিয়মিত হাঁটা, পেশিশক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম, নমনীয়তা ও ভারসাম্যের অনুশীলন জীবনের অংশ করা প্রয়োজন। WHO-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮–৬৪ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ। চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা থাকলে ভারসাম্য উন্নত ও পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে উপযোগী ব্যায়াম সপ্তাহে অন্তত তিন দিন করার পরামর্শ রয়েছে।
২. সুষম খাদ্য ও স্বাস্থ্যকর ওজন।
অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমিয়ে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, মাছ, পরিমিত প্রোটিন ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশিশক্তি ও দৈহিক সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য পুষ্টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
৩. তামাক ও ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহার।
ধূমপান, তামাক এবং ক্ষতিকর নেশাজাতীয় অভ্যাস থেকে দূরে থাকা জরুরি। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন দীর্ঘমেয়াদে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে এবং শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
৪. মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন।
শুধু শরীর নয়, মনকেও সুস্থ রাখতে হবে। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী ও সমাজের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা প্রবীণদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৫. আর্থিক ও সামাজিক প্রস্তুতি।
অবসরকালীন জীবন, চিকিৎসা ব্যয়, বাসস্থান, পরিবারের দায়িত্বের পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা সম্পর্কে মধ্যবয়স থেকেই পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘ জীবন যেন আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণ না হয়, সেজন্য ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিকল্পনা জরুরি।
প্রবীণ বয়সে করণীয় কী?
প্রবীণ বয়সে লক্ষ্য শুধু রোগমুক্ত থাকা নয়; বরং স্বাধীন, সক্রিয়, নিরাপদ, অর্থবহ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করা।
১. নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা।
বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটা, হালকা ব্যায়াম, পেশিশক্তি ও ভারসাম্যের অনুশীলন করা প্রয়োজন। যাঁদের বাতব্যথা, কোমরব্যথা, ঘাড় বা হাঁটুর সমস্যা, স্ট্রোক-পরবর্তী দুর্বলতা কিংবা চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যায়াম ও পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ করা নিরাপদ ও কার্যকর হতে পারে।
২. পড়ে যাওয়া প্রতিরোধ।
প্রবীণদের জন্য পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙা বা গুরুতর আঘাত পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি। তাই ঘরের মেঝে, সিঁড়ি ও বাথরুম নিরাপদ রাখা, পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা, পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক যন্ত্র ব্যবহার করা উচিত। চলাফেরার সক্ষমতা অনুযায়ী ভারসাম্য ও পেশিশক্তির অনুশীলনও গুরুত্বপূর্ণ।
৩. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা।
রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, চোখ, দাঁত, শ্রবণশক্তি, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করা উচিত। কোনো শারীরিক উপসর্গকে শুধু ‘বয়সের কারণে হয়েছে’ বলে অবহেলা করা উচিত নয়।
৪. ব্যথাকে বার্ধক্যের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া নয়।
কোমর, ঘাড়, হাঁটু, কাঁধ কিংবা অন্যান্য অস্থি-সন্ধির দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা অনেক ক্ষেত্রে মূল্যায়ন ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের পরিবর্তন ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।
৫. মানসিক ও সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকা
বই পড়া, লেখা, বাগান করা, গান শোনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক বা ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ প্রবীণদের জীবনকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে।
প্রবীণদের প্রয়োজন শুধু ওষুধ নয়—প্রয়োজন সময়, ভালোবাসা, সম্মান, নিরাপত্তা, সামাজিক সংযোগ এবং অংশগ্রহণের সুযোগ।
বাংলাদেশে কী করা প্রয়োজন?
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যৌথ পরিবার থেকে একক পরিবারে পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের জন্য শহরমুখী প্রবণতা এবং পরিবারের সদস্যদের বিদেশে অবস্থানের কারণে ভবিষ্যতে অনেক প্রবীণ একাকিত্ব ও পরিচর্যার সংকটে পড়তে পারেন।
তাই এখন থেকেই প্রয়োজন—
প্রতিটি এলাকায় Age-friendly Community বা প্রবীণবান্ধব কমিউনিটি গড়ে তোলা;
প্রবীণবান্ধব ফুটপাত, গণপরিবহন ও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা;
হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা;
কমিউনিটি পর্যায়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শারীরিক সক্রিয়তা ও ফিজিওথেরাপি কার্যক্রম চালু করা;
পড়ে যাওয়া প্রতিরোধ ও নিরাপদ চলাচল বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো;
প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংযোগকে স্বাস্থ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা;
পরিবারের সদস্যদের প্রবীণ পরিচর্যা বিষয়ে
প্রশিক্ষিত করা;
কর্মক্ষম প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি করা;
প্রবীণ নির্যাতন, অবহেলা ও বৈষম্য প্রতিরোধ করা;
তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে প্রবীণদের intergenerational activities বা আন্তঃপ্রজন্মীয় কার্যক্রম বাড়ানো।
WHO-এর Decade of Healthy Ageing 2021–2030 উদ্যোগও এমন পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেয়, যেখানে বয়স বাড়লেও মানুষ প্রয়োজনীয় কাজ করতে এবং অর্থপূর্ণ জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারেন।
সচেতনতা হোক সারা বছর
প্রবীণদের বিষয়ে সচেতনতা শুধু ১ অক্টোবরের একটি দিবসের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বছরের ৩৬৫ দিনই প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে।
‘আজকের তরুণ—আগামীর প্রবীণ’
এই বার্তাটি আমাদের সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে।
পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রবীণদের বাস্তব জীবন, সফলতা, সংগ্রাম, স্বাস্থ্য সমস্যা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লাব, হাসপাতাল, ফিজিওথেরাপি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে Healthy Ageing Campaign পরিচালনা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে তরুণদের বোঝাতে হবে—প্রবীণদের যত্ন নেওয়া মানে শুধু তাঁদের সেবা করা নয়; এটি নিজেদের ভবিষ্যৎকেও নিরাপদ করা।
শেষ কথা
আমরা যেন প্রবীণদের শুধু তাঁদের বয়স দিয়ে বিচার না করি। একজন প্রবীণ মানুষ মানে একটি জীবন্ত ইতিহাস, বহু বছরের অভিজ্ঞতা, সম্পর্কের ভাণ্ডার, জ্ঞান ও মূল্যবোধের ধারক।
আজ আমরা আমাদের প্রবীণদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করছি, আগামী দিনে আমরাও তেমন একটি সমাজের অংশ হব।
তাই আসুন।
যৌবনে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করি, মধ্যবয়সে বার্ধক্যের প্রস্তুতি নিই এবং প্রবীণ বয়সে সক্রিয়, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করি।
“সুস্থ প্রবীণ, সমৃদ্ধ পরিবার;
প্রবীণবান্ধব সমাজ, উন্নত বাংলাদেশ।”
লেখক:
সহকারী অধ্যাপক রূপক চন্দ্র রায়
MPhil, পাবলিক হেলথ গবেষক ও লেখক
বাত-ব্যথা ও প্যারালাইসিস, ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ
বিভাগীয় প্রধান—ফিজিওথেরাপি বিভাগ, GVIMT, কুমিল্লা
ফ্যাকাল্টি—গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ফিজিওথেরাপি কলেজ অ্যান্ড হেলথ সায়েন্স, সাভার, ঢাকা
চেম্বার–১: সিটি ল্যাব ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেন্ট সেন্টার, পুলিশ লাইন, কুমিল্লা
চেম্বার–২: সি আর পেইন অ্যান্ড ফিজিওথেরাপি রিসার্চ সেন্টার, ক্যান্টনমেন্ট, কুমিল্লা।
মোবাইল : ০১৭২২২৩৭৬৪২























