শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রবীণ বয়সের প্রস্তুতি শুরু হোক আজ থেকেই

সহকারী অধ্যাপক রূপক চন্দ্র রায় : প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৫ এএম
প্রবীণ বয়সের প্রস্তুতি শুরু হোক আজ থেকেই

Oplus_131072

google news দৈনিক কুমিল্লার ডাক এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন

যৌবনের সুস্থ অভ্যাসই হোক বার্ধক্যের নিরাপদ ভবিষ্যৎ

 

আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য—“The Age of Longevity: Rethinking Systems for Longer Lives”, অর্থাৎ “দীর্ঘায়ুর যুগে দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোকে নতুনভাবে ভাবা”। দীর্ঘায়ু মানবসভ্যতার একটি বড় অর্জন হলেও দীর্ঘ জীবন যেন সুস্থতা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদার সঙ্গে কাটে—সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ২০২৫ সালের প্রায় ১.২২ বিলিয়ন থেকে ২০৫০ সালে প্রায় ২.১ বিলিয়নে পৌঁছাতে পারে।

১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রতিবছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯১ সাল থেকে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।

প্রবীণরা শুধু একটি পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য নন; তাঁরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, মূল্যবোধ ও জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ধারক। তাই প্রবীণদের যত্ন নেওয়া শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়—এটি একটি সুস্থ, মর্যাদাপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গঠনের অপরিহার্য অংশ।

 

আজকের তরুণই আগামীর প্রবীণ

 

আমরা অনেক সময় মনে করি, বার্ধক্য জীবনের শেষ অধ্যায়। বাস্তবে বার্ধক্য জীবনের একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। কেমন হবে সেই বয়স, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে জীবনের আগের দশকগুলোর স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক প্রস্তুতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং আর্থিক পরিকল্পনার ওপর।

তাই প্রবীণ হওয়ার প্রস্তুতি প্রবীণ বয়সে নয়—যৌবন ও মধ্যবয়স থেকেই শুরু করা প্রয়োজন।

 

যৌবন ও মধ্যবয়সে কী করা প্রয়োজন?

১. নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম

 

নিয়মিত হাঁটা, পেশিশক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম, নমনীয়তা ও ভারসাম্যের অনুশীলন জীবনের অংশ করা প্রয়োজন। WHO-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮–৬৪ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ। চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা থাকলে ভারসাম্য উন্নত ও পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে উপযোগী ব্যায়াম সপ্তাহে অন্তত তিন দিন করার পরামর্শ রয়েছে।

 

২. সুষম খাদ্য ও স্বাস্থ্যকর ওজন।

 

অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমিয়ে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, মাছ, পরিমিত প্রোটিন ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশিশক্তি ও দৈহিক সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য পুষ্টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

 

৩. তামাক ও ক্ষতিকর অভ্যাস পরিহার।

 

ধূমপান, তামাক এবং ক্ষতিকর নেশাজাতীয় অভ্যাস থেকে দূরে থাকা জরুরি। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন দীর্ঘমেয়াদে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে এবং শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।

 

৪. মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন।

 

শুধু শরীর নয়, মনকেও সুস্থ রাখতে হবে। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী ও সমাজের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা প্রবীণদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

৫. আর্থিক ও সামাজিক প্রস্তুতি।

 

অবসরকালীন জীবন, চিকিৎসা ব্যয়, বাসস্থান, পরিবারের দায়িত্বের পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা সম্পর্কে মধ্যবয়স থেকেই পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘ জীবন যেন আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণ না হয়, সেজন্য ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিকল্পনা জরুরি।

 

প্রবীণ বয়সে করণীয় কী?

 

প্রবীণ বয়সে লক্ষ্য শুধু রোগমুক্ত থাকা নয়; বরং স্বাধীন, সক্রিয়, নিরাপদ, অর্থবহ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করা।

 

১. নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা।

 

বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটা, হালকা ব্যায়াম, পেশিশক্তি ও ভারসাম্যের অনুশীলন করা প্রয়োজন। যাঁদের বাতব্যথা, কোমরব্যথা, ঘাড় বা হাঁটুর সমস্যা, স্ট্রোক-পরবর্তী দুর্বলতা কিংবা চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যায়াম ও পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ করা নিরাপদ ও কার্যকর হতে পারে।

 

২. পড়ে যাওয়া প্রতিরোধ।

 

প্রবীণদের জন্য পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙা বা গুরুতর আঘাত পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি। তাই ঘরের মেঝে, সিঁড়ি ও বাথরুম নিরাপদ রাখা, পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা, পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক যন্ত্র ব্যবহার করা উচিত। চলাফেরার সক্ষমতা অনুযায়ী ভারসাম্য ও পেশিশক্তির অনুশীলনও গুরুত্বপূর্ণ।

 

৩. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা।

 

রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, চোখ, দাঁত, শ্রবণশক্তি, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করা উচিত। কোনো শারীরিক উপসর্গকে শুধু ‘বয়সের কারণে হয়েছে’ বলে অবহেলা করা উচিত নয়।

 

৪. ব্যথাকে বার্ধক্যের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া নয়।

 

কোমর, ঘাড়, হাঁটু, কাঁধ কিংবা অন্যান্য অস্থি-সন্ধির দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা অনেক ক্ষেত্রে মূল্যায়ন ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের পরিবর্তন ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।

 

৫. মানসিক ও সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকা

 

বই পড়া, লেখা, বাগান করা, গান শোনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক বা ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ প্রবীণদের জীবনকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে।

প্রবীণদের প্রয়োজন শুধু ওষুধ নয়—প্রয়োজন সময়, ভালোবাসা, সম্মান, নিরাপত্তা, সামাজিক সংযোগ এবং অংশগ্রহণের সুযোগ।

 

বাংলাদেশে কী করা প্রয়োজন?

 

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যৌথ পরিবার থেকে একক পরিবারে পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের জন্য শহরমুখী প্রবণতা এবং পরিবারের সদস্যদের বিদেশে অবস্থানের কারণে ভবিষ্যতে অনেক প্রবীণ একাকিত্ব ও পরিচর্যার সংকটে পড়তে পারেন।

তাই এখন থেকেই প্রয়োজন—

প্রতিটি এলাকায় Age-friendly Community বা প্রবীণবান্ধব কমিউনিটি গড়ে তোলা;

প্রবীণবান্ধব ফুটপাত, গণপরিবহন ও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা;

হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা;

কমিউনিটি পর্যায়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শারীরিক সক্রিয়তা ও ফিজিওথেরাপি কার্যক্রম চালু করা;

পড়ে যাওয়া প্রতিরোধ ও নিরাপদ চলাচল বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো;

প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংযোগকে স্বাস্থ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা;

পরিবারের সদস্যদের প্রবীণ পরিচর্যা বিষয়ে

 

প্রশিক্ষিত করা;

 

কর্মক্ষম প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি করা;

প্রবীণ নির্যাতন, অবহেলা ও বৈষম্য প্রতিরোধ করা;

তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে প্রবীণদের intergenerational activities বা আন্তঃপ্রজন্মীয় কার্যক্রম বাড়ানো।

WHO-এর Decade of Healthy Ageing 2021–2030 উদ্যোগও এমন পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেয়, যেখানে বয়স বাড়লেও মানুষ প্রয়োজনীয় কাজ করতে এবং অর্থপূর্ণ জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারেন।

 

সচেতনতা হোক সারা বছর

 

প্রবীণদের বিষয়ে সচেতনতা শুধু ১ অক্টোবরের একটি দিবসের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বছরের ৩৬৫ দিনই প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে।

 

‘আজকের তরুণ—আগামীর প্রবীণ’

 

এই বার্তাটি আমাদের সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে।

পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রবীণদের বাস্তব জীবন, সফলতা, সংগ্রাম, স্বাস্থ্য সমস্যা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লাব, হাসপাতাল, ফিজিওথেরাপি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে Healthy Ageing Campaign পরিচালনা করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে তরুণদের বোঝাতে হবে—প্রবীণদের যত্ন নেওয়া মানে শুধু তাঁদের সেবা করা নয়; এটি নিজেদের ভবিষ্যৎকেও নিরাপদ করা।

 

শেষ কথা

 

আমরা যেন প্রবীণদের শুধু তাঁদের বয়স দিয়ে বিচার না করি। একজন প্রবীণ মানুষ মানে একটি জীবন্ত ইতিহাস, বহু বছরের অভিজ্ঞতা, সম্পর্কের ভাণ্ডার, জ্ঞান ও মূল্যবোধের ধারক।

আজ আমরা আমাদের প্রবীণদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করছি, আগামী দিনে আমরাও তেমন একটি সমাজের অংশ হব।

তাই আসুন।

 

যৌবনে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করি, মধ্যবয়সে বার্ধক্যের প্রস্তুতি নিই এবং প্রবীণ বয়সে সক্রিয়, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করি।

“সুস্থ প্রবীণ, সমৃদ্ধ পরিবার;
প্রবীণবান্ধব সমাজ, উন্নত বাংলাদেশ।”

 

লেখক:
সহকারী অধ্যাপক রূপক চন্দ্র রায়
MPhil, পাবলিক হেলথ গবেষক ও লেখক
বাত-ব্যথা ও প্যারালাইসিস, ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ
বিভাগীয় প্রধান—ফিজিওথেরাপি বিভাগ, GVIMT, কুমিল্লা
ফ্যাকাল্টি—গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ফিজিওথেরাপি কলেজ অ্যান্ড হেলথ সায়েন্স, সাভার, ঢাকা

চেম্বার–১: সিটি ল্যাব ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেন্ট সেন্টার, পুলিশ লাইন, কুমিল্লা
চেম্বার–২: সি আর পেইন অ্যান্ড ফিজিওথেরাপি রিসার্চ সেন্টার, ক্যান্টনমেন্ট, কুমিল্লা।

মোবাইল : ০১৭২২২৩৭৬৪২

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী হ-ত্যা : সন্দেহভাজন সিএনজিচালক চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৫৮ পিএম
কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী হ-ত্যা : সন্দেহভাজন সিএনজিচালক চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার

Oplus_131072

কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার দুপুরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শুক্রবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. লুৎফর রহমান। তিনি জানান, গ্রেপ্তার সুমনকে কুমিল্লায় আনা হচ্ছে। এ ঘটনায় তিনি একাই জড়িত, নাকি অন্য কেউ জড়িত, তা জিজ্ঞাসাবাদের পর বিস্তারিত জানানো হবে।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা অটোরিকশার নিবন্ধনের সূত্র ধরে এর মালিককে শনাক্ত করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে অটোরিকশার মালিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, সুমন গাড়িটি ভাড়ায় চালাতেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সুমনের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। কয়েক বছর আগে বিয়ে করে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জয়নগর গ্রামে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস শুরু করেন তিনি। পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রায় এক মাস আগে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে সপ্তম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীর মুঠোফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে তার চলাচলের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল সে। তবে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। পরদিন ৫ অক্টোবর কুমিল্লায় ফিরে ভোররাতে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।

পুলিশের ভাষ্য, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে ওই শিক্ষার্থী। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে একটি গাড়ি থেকে একা নামতে দেখা যায়। আশপাশের কয়েকটি ক্যামেরার ফুটেজে মুঠোফোন হাতে ও কাঁধে ব্যাগ নিয়ে তাকে চলাফেরা করতেও দেখা গেছে। পরে সড়কের দিকে চলে যাওয়ার পর আর তার চলাচল ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।

মরদেহ উদ্ধারের পর নিহত শিক্ষার্থীর বাবা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বুধবার গভীর রাতে মেয়ে তাকে মুঠোফোনে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে আটকে রাখার কথা জানায় এবং উদ্ধারের অনুরোধ করে। তবে তিনি তখন ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি দেখতে পারেননি। ভোরে বার্তা দেখে লাইভ লোকেশন অনুসরণ করে সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন।

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান জানান, এ ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীর বাবা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। গ্রেপ্তার সুমনকে কুমিল্লায় আনার পর জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে।

৩২ বছরের ইমামতির অধ্যায় শেষ, আবেগঘন বিদায়ে মাওলানা আঃ রব

রুহুল আমিন চৌধুরী সুমন : প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৫ পিএম
৩২ বছরের ইমামতির অধ্যায় শেষ, আবেগঘন বিদায়ে মাওলানা আঃ রব

একটি মসজিদ, অসংখ্য স্মৃতি, আর দীর্ঘ ৩২ বছরের এক আত্মিক বন্ধন—বিদায়বেলায় আবেগ আর ভালোবাসায় সিক্ত হলেন থিরাপুকুর পাড় জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আঃ রব সাহেব। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কণ্ঠে আজান, নামাজে ইমামতি, ধর্মীয় শিক্ষা ও মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা আন্তরিক সম্পর্কের স্মৃতি মসজিদপ্রাঙ্গণে রেখে গেল এক আবেগঘন অধ্যায়।

তাঁর দীর্ঘদিনের সেবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে আয়োজন করা হয় বিদায়ী সংবর্ধনার। এ সময় একই সঙ্গে থিরাপুকুর পাড় জামে মসজিদের নতুন ইমাম হিসেবে মাওলানা সাইফুল ইসলামকে বরণ করে নেন মসজিদ কমিটির সদস্যরা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মসজিদ, মার্কেট ও মাদ্রাসা উন্নয়ন পরিচালনা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ও সাবেক কাউন্সিলর রাজিউর রহমান রাজিব, কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসেম, সিনিয়র সহসভাপতি হাজী আব্দুস সালাম মাসুক, সাধারণ সম্পাদক বদরুল হাসান রাব্বু, কমিটির অন্যান্য সম্মানিত সদস্য এবং স্থানীয় মুসল্লিরা।

দীর্ঘ ৩২ বছরের ইমামতির দায়িত্ব পালন শেষে মাওলানা আঃ রব সাহেবের বিদায় কেবল একজন ইমামের বিদায় নয়; এটি একটি এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা একজন মানুষের কাছ থেকে সাময়িক বিচ্ছেদের মুহূর্ত। তাঁর নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও ধর্মীয় সেবার স্মৃতি স্থানীয় মুসল্লিদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

অন্যদিকে, নতুন ইমাম মাওলানা সাইফুল ইসলামের আগমনে মসজিদের ধর্মীয় কার্যক্রম আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধ হবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন উপস্থিত মুসল্লি ও কমিটির সদস্যরা। বিদায়ী ইমামের সুস্থতা ও কল্যাণ কামনার পাশাপাশি নতুন ইমামের দায়িত্ব পালনে মহান আল্লাহর রহমত ও সহযোগিতা কামনা করা হয়।

নানিকে দেখতে এসে সড়কে মৃত্যু, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে গেলেন আরমান

দেবিদ্বার (কুমিল্লা) প্রতিনিধি : প্রকাশিত: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪৪ পিএম
নানিকে দেখতে এসে সড়কে মৃত্যু, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে গেলেন আরমান

নানিকে দেখতে সুদূর সিলেট থেকে কুমিল্লার দেবিদ্বারে এসেছিলেন ২৪ বছর বয়সী আরমান হোসেন। ট্রেন থেকে নেমে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে রওনা হয়েছিলেন নানাবাড়ির উদ্দেশে। কিন্তু প্রিয় নানির কাছে পৌঁছানো হলো না তাঁর। গন্তব্যে যাওয়ার আগেই দ্রুতগতির ট্রাকের ধাক্কায় সড়কে ঝরে গেল তরুণ এই প্রাণ। নাতির মরদেহের পাশে বসে ৭০ বছর বয়সী নানি রাবেয়া খাতুনের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে দুর্ঘটনাস্থলের পরিবেশ।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ভোর ৫টার দিকে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার চরবাকর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন অটো ব্রিকস ফিল্ডের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কোম্পানীগঞ্জগামী যাত্রীবাহী একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে কুমিল্লামুখী একটি দ্রুতগতির ট্রাক ধাক্কা দেয়। এতে অটোরিকশাটি সড়কে ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আরমান। এ ঘটনায় অটোরিকশার চালকও আহত হন।

নিহত আরমান হোসেন সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের ফখরুল ইসলামের ছেলে। পেশায় তিনি ছিলেন মোটরসাইকেল মেকানিক। তাঁর নানাবাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার পৌর এলাকার ভিংলাবাড়ি গ্রামে।

স্বজনদের বরাত দিয়ে জানা যায়, স্বামী ও ছেলেকে হারানোর পর দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় নাতি আরমানই ছিলেন বৃদ্ধা রাবেয়া খাতুনের প্রধান ভরসা। নানির ভরণপোষণের দায়িত্বও পালন করতেন তিনি। নাতিকে হারিয়ে এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন ৭০ বছর বয়সী এই নারী।

আরমানের পরিবারেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাঁর তিন বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে, নাম আরিয়ান। স্ত্রী স্বপ্না সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী, ছোট সন্তান ও অনাগত শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

এদিকে দুর্ঘটনার পর কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। সড়ক অবরোধের কারণে মহাসড়কের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। পরে সকাল ১০টার দিকে দেবিদ্বার থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করে।

মীরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আনিসুর রহমান জানান, দুর্ঘটনাস্থল থেকে আরমানের মরদেহ ও দুর্ঘটনাকবলিত অটোরিকশাটি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

নানিকে দেখতে এসে আরমানের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দুই পরিবারের স্বজনদের মধ্যে। পেছনে রয়ে গেলেন অসহায় নানি, স্ত্রী, ছোট্ট সন্তান ও পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় থাকা আরেকটি প্রাণ।

×