বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

ভারাক্রান্ত মন, কচু পাতার পানি ও সাংবাদিকতার চাকুরি!

শাহজাদা এমরান : প্রকাশিত: রবিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ৬:৫৯ পিএম
ভারাক্রান্ত মন, কচু পাতার পানি ও সাংবাদিকতার চাকুরি!
google news দৈনিক কুমিল্লার ডাক এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন

১.গত কয়েকদিন ধরে শরীরের সাথে মনটিও আমার ভালো যাচ্ছে না। ক্ষণে ক্ষনে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে মন। দেশের বেশ কয়েকটি জেলা থেকে কয়েকজন সহকর্মী জানিয়েছেন তাদের চাকুরি হারিয়ে বেকার জীবন কাটানোর কথা। এর মধ্যে ২৫ ফেব্রুয়ারি শনিবার সকালে খাগড়াছড়ি থেকে আমার পুরোনো এক সহকর্মী ফোন দিয়ে বললেন, এমরান ভাই আপনার অনলাইন নিউজ পোর্টাল কুমিল্লার জমিন এ কাজ করতে চাই। কথাটি বলতে যে উনার বেশ কষ্ট হচ্ছে এবং হৃদয় ভেঙ্গে যাচ্ছে তা প্রায় দুইশ কিলোমিটারের উপর দূরে কুমিল্লায় বসেই আমি বেশ টের পাচ্ছিলাম।

হঠাৎ করে কুমিল্লার অনলাইন নিউজে কেন কাজ করতে চাচ্ছেন তা জানতেই ভেসে এলো নীরব কান্নার শব্দ। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। প্রায় অর্ধ মিনিট চুপ থাকার পর নীরবতা ভেঙ্গে জানালেন, ভাই,দৈনিক দিনকাল সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। বেকার হয়ে গেছি। আপনি জানেন আমি কোন রাজনীতি করি না। সাংবাদিকতার জীবনে প্রথম মুক্তকন্ঠে কাজ করেছি। পরবর্তীতে মুক্তকন্ঠ বন্ধ হওয়ার পর অন্য পত্রিকা না পেয়ে দিনকালে জয়েন করেছি। সে থেকে এখন পর্যন্ত দিনকালেই আছি। দিনকাল বেতন না দিলেও নিউজ করে, ছবি তুলে, কিছু ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন ছেপে কষ্ট করে হলেও সংসারটা চালিয়ে নিয়েছি। এলাকার যে কোন সংবাদ সম্মেলন বা সব অনুষ্ঠানেই দাওয়াত পাই, যাই, কখনো সম্মানী পাই কখনো পাই না কিন্তু সারা দিন ঘুরে ফিরে নিউজ করি, ব্যস্ত থাকি, নিজকে সব সময় ব্যস্ত রাখি। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে পড়াচ্ছি। বাড়ি থেকে হালকা কিছু আসে। এভাবেই চলে আসছি আল্লাহর রহমতে কোন মতে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিজকে সুস্থ রাখার জন্যও ব্যস্ত থেকেছি। কিন্তু পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পর একেবারে বেকার। সারাদিন বাসায় থেকে থেকে ভালো লাগে না। স্থানীয় সহকর্মীরা কোন অনুষ্ঠনে দাওয়াত দেয় না। বলে, ভাই আপনারতো পত্রিকা বন্ধ। এলাকায় কয়েকটা অনলাইন থাকলেও মান নেই। তার উপর রয়েছে নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং ইত্যাদি। আপনার অনলাইনে কাজ করতে চাই টাকার জন্য না। যাতে সমাজ, পরিবারকে বলতে পারি আমি বেকার না। আমার এক মিডিয়া বন্ধ হলেও আরেকটায় জয়েন করেছি।

২. গত কয়েক বছর আগে একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন কাভার করার জন্য ৭/৮ জন সাংবাদিক নিয়ে কুমিল্লার একটি উপজেলায় গিয়েছিলাম। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকার এক রাঘব বোয়ালের বাড়িও ঐ উপজেলায়। হঠাৎ করে ঐ রাঘব বোয়াল আমার সাথে থাকা তার পত্রিকার প্রতিনিধিকে ফোনে এমন অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে লাগল। প্রতিনিধির অপরাধ, ঐ রাঘব বোয়ালের লোকেরা গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করে সিল মারবে এটা তার (প্রতিনিধির) জানা থাকার কথা। সুতরাং সে কেন তাকে না জানিয়ে ঐ নির্বাচনী এলাকায় আসলো। অথচ প্রতিনিধির ঐ নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে কথিত ঐ রাঘব বোয়ালের অনুমতি কিংবা জানতে চাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। বরং তিনি তার ঐ প্রতিনিধিকে বলতে পারতেন, শোন, তুমি কিন্ত ঐ দিকে যেও না। ওরা কেন্দ্রগুলি নিয়ে নিবে। এ কথা কর্তা ব্যক্তি বললে, সাংবাদিকতার তিন দশকের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, কোন প্রতিনিধিই কোটি টাকার জন্য হলেও ঐ দিকে যাবে না। অথচ, প্রতিনিয়ত জাতিকে জ্ঞান দেওয়া ঐ রাঘব বোয়ালের হুমকিতে চাকুরি হারানোর শংকায় সেদিন আমার ঐ সহকর্মীর বড্ড অসহায় মুখায়বটি আজো আমার মানসপটে ভেসে উঠে। প্রিয় সহকর্মীর ক্রদনরত চেহারাটি দেখে সেদিন মধ্যাহ্নের পূর্বেই নির্বাচনী এলাকা ছেড়ে শহর কুমিল্লায় চলে এসে আপন মনে গেয়ে উঠি এমপি মমতাজ বেগমের সেই বিখ্যাত বিচ্ছেদ গান, বন্ধু বুক ফাইট্টা যায়, ফাইট্টা যায়!

৩. বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করেই গণমাধ্যমের মালিক তার পত্রিকা কিংবা টিভি কিংবা অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধ করে দেওয়া আমাদের দেশে একটি স্বাভাবিক রেওয়াজে পরিণত হয়ে আসছে। মালিকের ইচ্ছের উপর নির্ভর করে শত শত সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী বেকারত্ব নামক অভিশাপের বিষ বাষ্পে নীল হয়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে। এমন কেস স্ট্যাডি রয়েছে অজস্ত্র।

সরকার মিডিয়া বন্ধ করলে সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকুরি চলে যায়, মালিক-সম্পাদক বিরাগবাজন হলে চাকুরি চলে যায় এবং মালিক গণমাধ্যম বন্ধ করে দিলে চাকুরি চলে যায়। একেবারেই কচু পাতার পানির মত স্বচ্ছ, সরল সাংবাদিকদের চাকুরি চলে যাওয়া। মাঝে মাঝে মনে হয়, সাংবাদিকতার চাকুরিটি হাওয়া থেকে বাতাস হয়ে ভেসে এসে বজ্রপাতে রূপান্তরিত হয়। বজ্রপাত যেমন এই এলো আবার এই গেলো। ঠিক তেমনি এই আমাদের হত্যভাগ্য পেশাটি।

একেবারেই নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, সরকার মিডিয়া বন্ধ করে দিলে কিংবা মালিক মিডিয়া বন্ধ করলে যে সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর চাকুরি চলে যায় তার ক্ষুদ্র একটি অংশই পরবর্তীতে কোন একটি মিডিয়া হাউজ খুঁজে পায়। অধিকাংশই কিছু দিন এদিক সেদিক ঘুরে ছোটখাটো কোন একটি পেশা বেছে নেয় কেউবা আবার শহুরে জীবনে সংসারের ঘানি টানতে না পেরে গ্রামে চলে যায়।

এভাবে আর কত গণমাধ্যম বন্ধ হবে আমাদের দেশের সরকার গুলোর রোশানলে পড়ে। গণমাধ্যমকে বলা হয় একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। অথচ সব সরকারের আমলেই রাষ্ট্রের এই অন্যতম স্তম্ভটি তাদের অসৎ ইচ্ছা, অনিচ্ছার পুতুলে পরিণত হয়। আমাদের দেশের আওয়ামীলীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টি যারাই অতীতে ক্ষমতায় ছিল এবং বর্তমানে আছে তারা সবাই চায় গণমাধ্যম তাদের দলীয় মুখপত্রে পরিণত হোক, তাদের পদলেহন করুক, লেজুরবৃত্তি করে দেশের বারোটা বাজলেও তাদের আখের গোছানোর কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করুক।

অথচ, আমাদের দেশপ্রেমিক নামের কথিত এই রাজনীতিবিদরা যখন বিরোধী দলে থাকে তখন গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতার জন্য জিকির করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। আবার সরকারে এসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে আইন করে গণমাধ্যম কর্মীদের শৃঙ্খলিত করে রাখতে চায়।

সব সরকারের আমলেই আমাদের দেশে কথিত কিছু মিডিয়া মোড়ল থাকে। তারা বড় বড় পত্রিকা কিংবা টিভির সম্পাদক, মালিক বা টিভি টক-শোর জাঁদরেল আলোচক বা সাংবাদিক। তারা পত্রিকায় বিশেষ প্রবন্ধ, নিবন্ধ লিখে এবং রাতে টিভির টক-শো করে নিজেদের মিডিয়া মোড়ল করে তুলে। তারা প্রতিনিয়ত সরকারকে জ্ঞান দেয়, জনগণকে জ্ঞান দেয়। গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করার জন্য জ্বালাময়ী বক্তব্য দেয়। অথচ, নিজের মিডিয়া হাউজে তিনি গণতন্ত্র দিতে পারেন না। একজন প্রতিনিধির পান থেকে চুন খসলেই দানবীয় আচরণ শুরু করেন। মুহুর্তেই তার রুটি রুজির একমাত্র অবলম্বনটি বাতিল করে দেন। নিজের হীন কায়েমী অসৎ স্বার্থ হাসিল করার জন্য প্রতিনিধিকে স্থানীয় রাজনীতিকদের ক্রীড়ানকে পরিণত করতে চান।

সরকারের হালুয়া রুটির ভাগ ভাটোয়ারা পাওয়ার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে কিছু দিন কথা বলেন। পরে যখন সরকার তাকে উচ্ছিষ্ট হালুয়া রুটি দিয়ে দেয় তখন আবার লেজ গুটিয়ে নিজের ব্যক্তিত্বহীনতাকে জাতির সামনে উম্মোচন করে সরকারের চামচামি করা শুরু করে দেন। হালুয়া রুটির জন্য নিজের সম্প্রদায়ের রক্ত খেতেও এই সকল তথা কথিত মিডিয়া মোড়লরা পিছপা হন না। কথায় আছে, কাকের মাংস কাকে খায় না। কিন্তু আমি বলি, কাকের মাংস কাকে না খেলেও আমাদের দেশের কিছু মিডিয়া মোড়ল আছেন তারা তাদের পদ পদবী রক্ষা করার জন্য ও নিজের আখের গোছানোর জন্য শুধু তাদের সম্প্রদায়ের (সাংবাদিকদের) মাংসই খায় না, তাদের মৃত দেহ নিয়েও ছিনিমিনি খেলতে ভুলেন না। তা না হলে আমাদের সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর রুনি হত্যা মামলা গত ১১ বছরেও নিস্পত্তি হয় না কেন। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি তাদের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই হত্যা কান্ডের প্রতিবাদে যখন আমাদের কথিত সাংবাদিক নেতাদের নেতৃত্বে সারাদেশ আন্দোলনে কম্পিত হয়ে উঠল, কেঁপে উঠল সরকারের মসনদ ঠিক তখনি ঐ আন্দোলনের কথিত নায়ককে করা হলো সদাশয় সরকারের উপদেষ্টা। সাংবাদিকদের আন্দোলন উপদেষ্টার চেয়ারের সৌজন্যে ভেসে গেল বুড়িগঙ্গায়। গত প্রায় এক যুগ ধরে মৃত প্রায় বুড়িগঙ্গা দিয়ে অসংখ্য লাশ ভেসে উঠলেও ভেসে উঠেনি প্রিয় সহকর্মী সাগর-রুনির হত্যার প্রতিবাদের আন্দোলন। সাগর-রুনির একমাত্র ছেলে মেঘও আস্তে আস্তে বেড়ে উঠছে আর দেখছে তার বাবা-মার এক সময়ের সহকর্মীরা হালুয়া রুটির জন্য কিভাবে সম্প্রদায়ের রক্তের সাথে বেঈমানি করে।

পৃথিবীর সব পেশাতেই কম বেশী নিশ্চয়তা আছে চাকুরির। কিন্তু উপরের তিনটি কেস স্ট্যাডি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ নামে পরিচিত গণমাধ্যমে যারা কাজ করেন, যাদেরকে বলা হয় জাতির বিবেক সেই সাংবাদিকদের চাকুরির কোন নিশ্চয়তা নেই, নেই জীবনের নিশ্চয়তাও। যে কেউ সাংবাদিকদের বকতে পারে, মারতে পারে, ডিজিটাল নিরাপত্তা নামের আইন দিয়ে সাংবাদিকদের লাল দালানের ভাত খাওয়াতে পারে কোন সমস্যা নেই। কারণ, অন্য যেকোনো পেশার কিছু হলে সবাই একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ করে, প্রয়োজনে প্রতিরোধ করে। আর আমরা সাংবাদিকরা শুধু মাইর খাই। আমাদের মধ্যে কোন ঐক্য নেই। আবার আমাদের দেশের যে কোন পেশার লোকজনের ইচ্ছে হলো সাংবাদিক হওয়ার, ব্যাস, সে সাংবাদিক হয়ে গেলো। হয়তো টাকার জোরে, কিংবা মামু-খালু দিয়ে। সাংবাদিকতার নূন্যতম তার জ্ঞান থাকুক বা না থাকুক, লিখতে পারুক বা না পারুক, শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক সেই দিকে কারো কোন বিবেচ্য বিষয় নেই। অর্থাৎ গরিবের বউ যেমন সবার বাউজ ঠিক তেমনি সে যেই হোক, যেভাবে পারে একটি কার্ড সংগ্রহ করেই সাংবাদিক বনে যান। হোন্ডা কিংবা গাড়িতে বড় হরফে লিখে দেন সাংবাদিক। গরিবের বউয়ের মতই সবার বাউজ এবং সবাই সাংবাদিক।

জানি না, জীবনে কোন দিন এর ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাব কি না। কারো ব্যক্তিগত ইচ্ছা আর অনিচ্ছার উপর আর কত দিন আমাদের চাকুরি নির্ভর করবে বা গণমাধ্যম প্রকাশনা চালু থাকবে, তা জানি না। শুধু এতটুকু জানি, কচু পাতার পানির মতই আমার সাংবাদিকতার চাকুরি ক্ষণস্থায়ী। আর এই ক্ষণস্থায়ী জীবন নিয়েই দেশ তথা জাতির কল্যাণে যত দিন সম্ভব কাজ করে যেতে চাই।

লেখক : সাংবাদিক, সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক ও টক-শো উপস্থাপক।

অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহী খিড়াই নদী

দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি : প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:২২ পিএম
অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহী খিড়াই নদী

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বিটেশ্বর ইউনিয়নের বিরবাগ গোয়ালী ও দুর্গাপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী খিড়াই নদী কচুরিপানা ও আবর্জনায় প্রায় সম্পূর্ণ ঢেকে গেছে। নদীর বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে কচুরিপানা ও বর্জ্য জমে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে স্থানীয় পরিবেশ ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। নদীটি দূষণমুক্ত করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও পরিবেশকর্মীদের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বাপা দাউদকান্দি উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান তালুকদার খিড়াই নদীর বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। নদী ও জলাধারকে কচুরিপানা ও বর্জ্যমুক্ত করে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সুধী সমাবেশ ও আলোচনা সভা আয়োজনের স্থান নির্ধারণ করতেই এ পরিদর্শন করা হয়।

বাপা কেন্দ্রীয় কমিটির আজীবন সদস্য, কুমিল্লা জেলা কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও দাউদকান্দি উপজেলা শাখার প্রধান উপদেষ্টা পরিবেশবিদ অধ্যাপক মতিন সৈকত এবং উপজেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম স্বপনের পরামর্শক্রমে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।

পরিদর্শনকালে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা, নৈয়াইর সাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক এবং বাপা দাউদকান্দি শাখার উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিন সিকদারের সঙ্গে বাপা নেতৃবৃন্দ মতবিনিময় করেন। এ সময় নদীর বর্তমান অবস্থা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং দ্রুত কচুরিপানা ও আবর্জনা অপসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়।

বাপা দাউদকান্দি উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান তালুকদার বলেন, নদী শুধু জলপ্রবাহ নয়; এটি প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। খিড়াই নদীকে বাঁচাতে নিয়মিত পরিচর্যা, নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ এবং দ্রুত কচুরিপানা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য ও নির্মল পরিবেশ গড়ে তুলতে দল-মতনির্বিশেষে স্থানীয় জনগণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা আশা করছেন, প্রশাসনিক সহায়তা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে খিড়াই নদী থেকে কচুরিপানা ও আবর্জনা অপসারণ করে এর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

পৈতৃক জমি নিয়ে বিরোধ, বসতবাড়ি ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ

চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি : প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:০৯ পিএম
পৈতৃক জমি নিয়ে বিরোধ, বসতবাড়ি ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে বসতবাড়ির টিনের বেড়া ও জানালার থাই গ্লাস ভাঙচুর, ভবনের পাশে মাটি কেটে ঝুঁকি তৈরি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চৌদ্দগ্রাম থানায় দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চৌদ্দগ্রাম মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ আরিফ হোছাইন। উপজেলার উজিরপুর ইউনিয়নের জগমোহনপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

থানায় দায়ের করা অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার শীতলিয়া মৌজায় আব্দুল কুদ্দুছের বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ-বণ্টনের পর তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ অংশ ভোগদখল করে আসছেন। তবে সম্পত্তির একটি অংশ নিয়ে তাঁর সৎ ভাই আব্দুল ওয়াদুদের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছে। এ নিয়ে আদালতে একটি মামলাও চলমান রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে আব্দুল ওয়াদুদসহ কয়েকজন ব্যক্তি এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জন বিরোধপূর্ণ সম্পত্তিতে গিয়ে আব্দুল কুদ্দুছের বসতবাড়ির চারপাশের টিনের বেড়া ও জানালার থাই গ্লাস ভাঙচুর করেন। এ সময় পাকা বসতঘরের পূর্ব পাশে মাটি কেটে নেওয়া হয়। এতে দোতলা ভবনটি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারী। বাধা দিতে গেলে তাঁকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি সুষ্ঠুভাবে ভাগ-বণ্টন করে যার যার অংশ বুঝে নেওয়ার জন্য তিনি একাধিকবার অনুরোধ করেছেন। তাঁর দাবি, সৎ ভাই নিজের অংশ অন্য মৌজায় নিয়ে প্রায় ২০ বছর আগে বিক্রি করেছেন। অন্যদিকে, তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে এই জমি ভোগদখল করে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, তিনি তাঁর বাবার প্রথম সংসানের ছেলে। তাঁর দাদা মারা যাওয়ার আগেই বাবা মারা যান। এরপর সৎ ভাই-বোনসহ ১০ জনের সংসারের খরচ তিনি কষ্ট করে চালিয়েছেন। বণ্টন অনুযায়ী ওই জমিতে তাঁর অংশ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভাইয়েরা নিজেদের অংশে বসতঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। ২০২৩ সালে আর্থিক সংকটের কারণে নিজের অংশের জমি খারিজ খতিয়ান করে বিক্রি করেছেন। জমি নিয়ে তাঁর ভাইয়েরাই ঝামেলা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভেকু দিয়ে মাটি কাটার বিষয়ে ফারুক বলেন, নিজের পৈতৃক সম্পত্তিতে বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য মাটি কেটে ভরাট করছেন তিনি। কুদ্দুছের ঘরের পেছনে প্রায় ১০ ফুট জায়গা রেখে মাটি কাটা হচ্ছে। ভবনের ক্ষতি করার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য তাঁর নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

চৌদ্দগ্রাম মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ আরিফ হোছাইন বলেন, উজিরপুর ইউনিয়নের শীতলিয়া এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দেবীদ্বারে ন্যায় বিচারের দাবীতে মানববন্ধন; ওসি ও এসআই অজয়ের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

মো: বিল্লাল হোসেন: প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩৫ এএম
দেবীদ্বারে ন্যায় বিচারের দাবীতে মানববন্ধন; ওসি ও এসআই অজয়ের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

আমি আমার স্ত্রী হত্যার বিচার চাই। পুলিশি হয়রানির আতঙ্কে আমার স্ত্রী হাসনা বেগম (৫৬) হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। অর্থের অভাবে আমার স্ত্রীর উন্নত চিকিৎসা করাতে পারি নাই। প্রতিপক্ষের টাকার গরমে থানা পুলিশ আমাদের মামলা নেয় নাই। আসামীরা সহজে জামিন পেতে এবং মামলা থেকে খালাস পেতে নিলাফুলা-জখম দেখিয়ে নিজ মনগড়া এজাহার লিখে আমার ছেলের স্বাক্ষর নিয়ে মামলা রুজু করে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবীদ্বার নিউমার্কেট মুক্তিযোদ্ধা চত্বরের স্বাধীনতা স্তম্ভের সংলগ্ন সড়কে আয়োজিত মানববন্ধন চলাকালে নিহত হাসনা বেগমের স্বামী আব্দুল আজিজ এসব কথা বলেন।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে মাছ ধরার সময় তর্কাতর্কি কেন্দ্র করে দেবীদ্বার পৌরসভার ভোষণা গ্রামের আব্দুল আজিজের বাড়িতে ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নবী নেওয়াজ সহ বহিরাগত সন্ত্রাসী হামলায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারপূর্বক বিচারের দাবিতে এবং একই ঘটনায় থানা পুলিশের যোগসাজশে করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে এলাকাবাসীর আয়োজনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধনে আব্দুল আজিজ আরো বলেন, প্রতিপক্ষের মামলা গ্রহণ করে আমাদের হয়রানি করে। ওই মামলার তদন্তে ৬ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) শ্রী অজয় চক্রবর্তী বাড়িতে এসে আমার ছেলে (মামলার বাদী) আল আমিন ভ্যান চালিয়ে মামলা চালাতে পারবে না বলে, মামলা তুলে নিয়ে মিমাংসায় চলে যেতে চাপ দিতে থাকেন, বয়স হলে দাত এমনিতেই পড়ে যাবে, তাদের কথা-বার্তায় আমার স্ত্রী সন্তানদের গ্রেফতার আতঙ্কে হার্ট এটাকে ৩ দিন চিকিৎসাধীন থেকে ৯ অক্টোবর কু.মে.ক হাসপাতালে মারা যান।

মো. শাহজালাল বলেন, আক্তার হোসেনের ছেলে শুভ বাড়ির পাশে আমাদের একটি গর্ত সিচে মাছ ধরছিল, ঐসময় একই বাড়ির মৃত সিরাজুল ইসলামের ছেলে ট্রাক্টর চালক নবী নেওয়াজ (৩৮) শুভর মাছগুলো ফেলে দেয়। এ নিয়ে শুভ ও নবী নেওয়াজের মধ‍্যে বাগবিতন্ডা ও হাতাহাতি হয়। এ ঘটনায় ২০ অক্টোবর বিকেলে নবী নেওয়াজ ৬টি সিএনজি যোগে বহিরাগত ভাড়াটে সন্ত্রাসী প্রায় ৫০/৬০ জন নিয়ে তাদের বাড়িতে অতর্কিত হামলা, ভাংচুর, লুটপাট চালায়।
আবদুল আজিজের ছেলে গুরুতর আহত আক্তার হোসেনের স্ত্রী শাহিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী তাদের কাছে হাত জোর করে-আব্বা ডেকেও রক্ষা পায়নি, আমার ছেলে শুভ তার বাবাকে আর না মারতে প্রাণ ভিক্ষা চায়, তাকেও কুপিয়ে গুরতর আহত করে, আমার প্রতিবন্ধী মেয়েকেও মারে, আমি আমার স্বামী ও সন্তানের প্রাণ ভিক্ষা চাইতে গেলে ওরা আমাকেও কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। আমার স্বামী তাদের মারধরে ঘরে পয়খানা- প্রশ্রাব করে দেয়। তারা আমার স্বামীর নিচের চোয়ালের তিনটি দাত ভেঙ্গে ফেলে, কুপিয়ে গুরুতর জখম করে মৃত ভেবে ফেলে যায়। আমার স্বামীর পায়ের অংশে কাটায় ৩৮ টি সেলাই দিতে হয়, ৩টি দাত ফেলে দিলেও এসব কথা মামলায় উল্লেখ করেনি। মামলায় ফুলা জখম দেখিয়েছে। অর্থাভাবে স্বামীর চিকিৎসা করতে পারছিনা, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম অসুস্থ‍ স্বামী কাজে যেতে পারছেনা, তাই আজ প্রায় একমাস আমরা মানুষের সহায়তায় অর্ধাহার অনাহারে আছি। ভবিষ‍্যৎ কি হবে জানিনা।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, কাজী লোকমান হোসাইন, মোঃ আউয়াল খাঁন, মোঃ শাহজালাল, মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, ভুক্তভোগী পরিবার থেকে আব্দুল আজিজ, শাহিনা বেগম, কামরুল হাসান প্রমুখ। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপজেলা সদরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
মানববন্ধনে বক্তরা বলেন, মাছ ধরা নিয়ে হাতাহাতি ও বাকবিতন্ডায় বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে একটি দরিদ্র পরিবারকে মারধর, হামলা ও ঘরবাড়ি ভাংচুর এবং লুটপাট করে নিঃস্ব করে দিয়েছে নবী নেওয়াজ, আব্দুল কাদের,দুলাল মিয়া, রাকিব@সাগর ও মো: ওমরসহ তার ভাড়া করা সন্ত্রাসীরা। অতি দ্রুত আসামী পক্ষের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও সন্ত্রাসী হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবী জানান। তাদের দাবী না মানা হলে পরবর্তীতে বৃহৎ আন্দোলনের হুশিয়ার দেন।

এবিষয়ে দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, মামলার এজাহার ওনারা লিখে এনেছেন। আমরা মামলা রেকর্ড পূর্বক আসামী আটক করে আদালতে সোপর্দ করেছি, বিজ্ঞ আদালত যদি আসামীকে জামিন দেয় সেক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার নেই। মামলার এজাহারে যদি দাঁত পরার বিষয় বা অন্য কোন গুরুতর জখমের কথা বাদ পরে থাকে তদন্তে এড করে দেওয়া যাবে সমস্যা নেই। তাছাড়া মারামারির ঘটনায় কাউন্টার মামলা হয়, যা অপর পক্ষ করেছে।

×