আদালত চত্বরে পকেটমার ও হকারদের উৎপাত
অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে আদালত প্রাঙ্গণে যে ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা দরকার তা নেই ঢাকার নিম্ন আদালত এলাকায়। উপরন্তু পকেটমার, মাদকসেবী, অবাঞ্ছিত লোকজনের অবাধ আনাগোনা ও হকারদের উৎপাতে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে আদালত চত্বরের নিরাপত্তা। এ ছাড়া আদালত প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোয় পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকা, আদালত প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ও বিশ্রামাগার না থাকা এবং পর্যাপ্ত টয়লেট সুবিধা না থাকায় বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টদের প্রতিদিন চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এদিকে এ ধরনের ভোগান্তি সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা।
পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব : আদালত চত্বরে চুরি-ছিনতাইসহ একাধিক অপকর্মের ঘটনা ঘটলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত ভবনে প্রবেশে কোনো আর্চওয়ে নেই। এমনিভাবে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদলতের দুটি ভবনের একটিতেও আর্চওয়ে নেই। অপরদিকে চিফ জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও আর্চওয়ে নেই। তবে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রবেশপথে দুটি আর্চওয়ে থাকলেও প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে আর্চওয়ের বাইরে দিয়ে লোকজন অনায়াসে প্রবেশ করতে দেখা যায়। ভিড়ের মধ্যে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের মোবাইল, মানিব্যাগ ও মূল্যবান জনিসিপত্র চুরি ও পকেটমারের ঘটনা ঘটে। মো. বোরহান উদ্দিন নামে এক বিচারপ্রার্থী জানান, তিনি একটি মামলার বাদী। মামলায় হাজিরা দিতে তিনি মহানগর দায়রা জজ আদালতে কয়েক দিন পূর্বে আসেন। কিন্তু আদালতের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশের সময় তার পকেট থাকা ৫০ হাজার টাকার দামি একটি স্যামসাং মোবাইল চুরি হয়ে যায়। শখের দামি মোবাইলটি পকেটমার নিয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিক তিনি হতবাক হয়ে যান এবং মানসিকভাবে অনেক কষ্ট পান।
মো. শাহীন আহম্মেদ নামে আরেকজন বিচারপ্রার্থী জানান, তিনি একটি মামলায় বাদী হিসেবে হাজিরা দেওয়ার জন্য গত কয়েক দিন আগে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসেন। আদালতে প্রবেশের সময় তার পকেট থেকে মোবাইল সেটটি চুরি হয়ে যায়। তিনিও তার মোবাইলটি হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যান। তিনি আদালত অঙ্গনে আরও বেশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানান। সরেজমিন আরও দেখা যায়, আদালতের অভ্যন্তরের রাস্তার দুই পাশে মোটরসাইকেল পার্কিং ও হকাররা বিভিন্ন রকমের ফলমূল ও কাঁচাবাজার বসিয়ে ব্যবসায় ব্যস্ত থাকেন। এ ছাড়া পাগলবেশী, মাদকসেবী ও অবাঞ্ছিত লোকজনের অবাধ আনাগোনায় আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
বিশুদ্ধ পানি ও বিশ্রামাগার সংকট : আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের জন্য আদালত প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ষষ্ঠ তলা ভবনে বিচারপ্রার্থীদের জন্য তৃতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ তলায় তিনটি টয়লেট রয়েছে। এ ছাড়া আরও দুটি টয়লেট থাকলেও তা তালাবদ্ধ। অধিকাংশ টয়লেট ব্যবহারে দিতে হয় টাকা। তবে সেখানে এমনই দুর্গন্ধ যে প্রবেশ করাই দুরূহ। আর এসব টয়লেটের পাশ দিয়ে হাঁটাচলা করা অনেক কষ্টের। এ ছাড়া বিচারপ্রার্থীদের জন্য বিশ্রামাগার নেই বললেই চলে। নারী ও শিশু বিচারপ্রার্থীদের জন্য রেবতি ম্যানশনে একটি বিশ্রামাগার থাকলেও সেখানে লোকজন তেমন যায় না।
দিনে ফেরিওয়ালা, রাতে মাদকসেবী ও অবাঞ্ছিত লোকজনের দৌরাত্ম্য : আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী ছাড়াও বহিরাগত লোকজনের আনাগোনা রয়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, দিনের বেলায় আদালতে হকারদের রাজত্ব চলে। শতাধিক হকার অবাধে বিচরণ করে। তাদের কেউ কেউ আবার স্থায়ী আসন গেড়েছে। আদালত চত্বরে চা, পান, সিগারেট থেকে শুরু করে ইঁদুর-তেলাপোকা মারার বিষ, শার্ট-কোট-গাউন, মোবাইল সিম নিবন্ধন, জুতা পলিশ, ঝালমুড়ি, আচার, বাদাম, আইসক্রিম, কলা, পেঁপে, শসা, গাজর, আনারস, ডাব, মাছ ও মুরগি সবই বিক্রি হয়। এ ছাড়া রাত হলেই চত্বরে মাদকসেবী ও অবাঞ্ছিত লোকজনের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়।
সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় আদালতপাড়া :
আদালতপাড়ায় পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা না থাকার কারণে একটু বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায়। মুষলধারে বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। প্লাবিত হয়ে যায় পুরো আদালত এলাকা। এতে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা পড়েন চরম বিপাকে। এমন পরিস্থিতে হেঁটে চলার মতো অবস্থা থাকে না। রিকশা নিয়ে এক আদলত থেকে অন্য আদালতে যেতে দেখা যায় অনেককে। পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা। আইনজীবী শেখ মাহদী বলেন, রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠন হলো বিচার বিভাগ। আদালতের এসব অব্যবস্থাপনা অবশ্যই সংস্কার করা উচিত। প্রায়ই শোনা যায়, কারও মোবাইল ফোন কিংবা মানিব্যাগ পকেটমার নিয়ে গেছে, এমনকি আসামি ছিনতাই হওয়ার ঘটনা পর্যন্ত শোনা যায়! মাদকসেবী এবং অবাঞ্ছিত মানুষের অবাধ চলাফেরার মধ্য দিয়ে এটাই বোঝা যায়, আদালতের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন নয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আইনজীবী মো. রবিউল ইসলাম বলেন, আদালতপাড়ায় বাজার কেন? প্রশাসন কিংবা আইনজীবী সমিতির যৌথ প্রচেষ্টায় বাজারের জন্য আলাদা কোনো স্থান বরাদ্দ দেওয়া যায় কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাই। এ ছাড়া আদালতের টয়লেট ব্যবস্থাপনা এতটাই শোচনীয় ও নোংরা যে, পাশ দিয়ে হাঁটতে গেলে দুর্গন্ধে যে কেউই অসুস্থ হয়ে পড়বে। টয়লেট পরিষ্কার রাখার জন্য নিযুক্ত লোকবল না থাকার জন্যই এ চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়। আমার মতে, ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে যে টয়লেট ব্যবস্থাপনা রয়েছে, আদালতপাড়ায় বিচারপ্রার্থীদের জন্য সে রকম ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩-এর স্পোশাল পাবলিক প্রসিকিউটর মাহমুদা আক্তার বলেন, আদালত প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত টয়লেট ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা বেশ ভোগান্তিতে পড়ে। বয়স্ক, নারী ও শিশুরা যেন আদালতে এসে অসুবিধায় না পড়ে সে বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে।
ঢাকার মহানগর পিপি আবদুল্লাহ আবু বলেন, আদালত চত্বরে হকার ও অবাঞ্ছিত লোকজনের আনাগোনা বন্ধ করতে হবে। আদালত প্রাঙ্গণকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। সর্বোপরি আদালতের নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে পকেটমার কিংবা চুরির ঘটনা টুকিটাকি হতে পারে। গণহারে এ ধরনের ঘটনা ঘটার কোনো সুযোগ নেই। আমরা সার্বক্ষণিক আদালতের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকি। পাশাপাশি আদালত চলাকালে লালবাগ জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার, কোতোয়ালির সহকারী পুলিশ কমিশনার, কোতোয়ালির অফিসার ইনচার্জ, ইন্সপেক্টর (তদন্ত) ও আমার তদারকিতে মোট ৪৬ জন পুলিশ সদস্য আদালতের সার্বিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকেন। এ ছাড়া রাতেও দুজন অফিসারের নেতৃত্বে মোট ১২ জন সদস্য নিয়োজিত থাকেন। আদালতের চারপাশে তিনটি মোবাইল পিকেট পার্টিও আদালতের নিরাপত্তার কাজে প্রতিদিন নিয়োজিত থাকে।


























